Archive for the ‘আমার জার্নাল’ Category

হাতের লেখা

Monday, January 28th, 2008

ডাকে কিছু কবিতা এলো। ফুলস্কেপ কাগজে লেখা হাত ও কলম। ঘোরানো ঘরোয়া শব্দের মাথাগুলি গোল হয়ে উঠে বা কখনো নেমে, পরষ্পরের কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে, যেন ভাঁজ করা পাতার এলোপাথারি মাঠজুড়ে সাঁওতালি নাচ জমেছে খুব চাঁদের আলোয়। মাঝে মাঝে কিছু দর্শনার্থী, ট্যুরিস্ট লালে লেখা হেড লাইন, দিকনির্দেশ, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

এসব দৃশ্য দেখে ছোটোবেলার সেই হাতের লেখার কথা মনে হয় যে রোজ বিকেলে গল্প করতে আসতো সান্টুদের বাড়িতে আর সন্ধে হলে রুলটানা খাতার বারান্দায় বসে ঢুলে ঢুলে নামতা পড়তো চাপাসুরে। ছোটোবেলার ঠিক পরের বেলায়, যেদিন ‘স’ ‘জ’ ও ‘ম’ লেখার কায়দা বদল হয়, সেদিন এই ছোটোবেলার হাতের লেখা খুব দুঃখ পায় ও সারারাত অঙ্কখাতার পেছনের রাফ করার পাতায় বসে বসে মিহিসুরে কাঁদে। পরদিন সকাল থেকে তাকে আর দেখা যায় নি, শুধু একবার ছাড়া। তখন মেজোবেলার হাতের লেখার রমরমা। তার ঠাট কায়দায় ছোটোবেলার হাতের লেখার কথা মিলিয়ে যায় অচিরেই।

এর অনেকদিন পরে, যখন বড়বেলার হাতের লেখাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানিয়ে হাতের লেখার বাড়িতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন, ইনফ্যাক্ট তখনি শুধু একবার, ছোটোবেলা, মেজোবেলা ও বড়বেলার তিন হাতের লেখাকে পরষ্পরের গলা জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখা যায়। সেই শেষ। তারপরে তাদের কাউকে আর দেখা যায় নি।

আজ ডাকে আসা কবিতা দেখে তিনজন হাতের লেখার কথাই মনে পড়ে বার বার।

জার্নাল 02

Wednesday, August 8th, 2007

বেশ কয়েকমাস লেখালিখির চৌহদ্দি থেকে বেপাত্তা। মনোযোগের অভাবের নামে দোষটা চাপিয়ে দিয়ে নিপাট দাঁত কেলাচ্ছি। জীবনের সঙ্গে তো ঝামেলা সেই হিন্দু হোস্টেল থেকে। জীবনের ভাগে তখন পাঁচ নং ওয়ার্ডের ক্যান্টিন আর আমি তখন অমিতাভর ভাগে, ঐ পাঁচ নম্বরেই। জীবনের এই পর্যায়েই জীবন প্রত্যক্ষ ভাবে আমার সামনে আসে এবং তার কালো তৈলাক্ত ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে 84 টা পান্তুয়ার দাম চায়। জীবন এর আগে, এবং এর পরেও, আমার কাছে এরূপ বেয়াক্কেলে আবদার খুব করেছে। ফলে, আমি হুঁ হুঁ তানানানা ইত্যাদি ক’রে যেতে থাকি। জীবন স্বাভাবিকভাবেই আমার উপর উদুম খেঁড়ে যায়। অথচ, এই আমি কী-বোর্ড ছুঁয়ে মা শেতলার কিরে কেটে বলতে পারি, জীবন বেটা ডাহা ঢপবাজ, 84 টা পান্তুয়া এক সঙ্গে শুধু আমি আমার জীবনে না, জীবনও তার গোটা জীবনে মনে হয় একসঙ্গে খেয়ে দেখে নি। জীবনের এই বেমালুম বেহায়াপনায় আমার হাড় জ্বলে গেলেও, পরে ‘ধূসর জীবনানন্দ’ পড়ে বুঝতে পারি, স্থান-কাল-পাত্রের ভেদ থাকলেও আসলে সকল জীবনের প্রকৃত স্বরূপই এইমত এক। অতএব জীবনের পান্তুয়ার হিসেব বুঝতে বুঝতে ঈষৎ ক্লান্ত হ’য়ে হেদিয়ে শেষ-মেষ আবার যখন কলম ঝাড়লুম, তখন দেখি কোথায় পান্তুয়া, বরং তেজারতির খাতায় খামোখা তেজপাতার আড়ৎ। এই বাজারে অনেক হেগে-পেদে যা-ও দু’একটি লেখা লিখলুম, তা-ও কেমন মিয়ানো মিয়াও মিয়াও শোনালো। লেখা বলতে ধকে কুলোলো না। বললাম, খসড়া। বাওয়ালীর নতুন ধুয়ো।

আসলে নিষ্পৃহতা এক প্রকার বিলাতি জামা, নীল বা চারকোল রঙের দেওয়ালে যা ঝোলানো থাকে। কোমরের কাছে লেগে থাকে লাল কাপড়ে মোড়া সাদা সুতোর একটি নাম। তাতেই সর্বস্ব বাঁধা থাকে।

তরমুজকাল

Thursday, May 10th, 2007

Digital Painting - Melon Time by Samit Roy

মৃত তরমুজ দেখি এ সীজনে ফালা ফালা লাল। ভাবি এ তরমুজকাল সচমুচ খুব নিষ্ঠুর মাস। এই মাসে ঘন ঘন চাকু বসে গভীরে আর আমাদের অশুদ্ধ রক্তের পাশে লালকালিতে লেখা হয় নং তিন আর নামপত্র সই।

আসলে এ মাসে, এই এপ্রিল মাসে, আমাদের ভিতরে ভিতরে বড় লালে লাল হয়।

ভ্রমণকাহিনী

Friday, March 9th, 2007

ভ্রমণকাহিনী
[2004]

এক:

আমাদের শষ্যক্ষেত্র ভারী হচ্ছে তখন আর বন্দর পেরোলেই একে একে আলোকস্তম্ভ পথ ও বৃক্ষসমূহ ঝুঁকে পড়ছে রাত্তিরে, পাষাণ ল্যান্ডস্কেপে। হাওয়ার জানলায় কাঁচ লেগে গেলে দেখা যাচ্ছে প্রায় চৌকো এক একটি বাক্স জুড়ে কিভাবে টুপ্ টুপ্ ক’রে অন্ধকার জ্বলে উঠছে দেখা না যাওয়ার মতো দূরত্বের দিগন্তে। একটু এগোলেই আলপথ বরাবর ডানদিকে ওৎ পেতে বসে থাকছে পাথর, ঠান্ডা, অনেকটা পাহাড়ের মতো ছোপ ফেলছে মাঠশেষে অন্ধকারে কালো কালো পাহাড় বলে মনে হতে পারে ব’লে। ধাবা ও সীমান্তের গ্রাম থেকে হঠাৎ হঠাৎ লন্ঠন ছল্কে মুহূর্তেকের জন্য চলে আসছে সরকারী বিদ্যুৎ আর পরের জনপদ শুরু হওয়ার কথা হলে জেগে থাকছে নক্ষত্রপুঞ্জ, স্থির ও মাটির কাছে নেবে এসেছে ভেবে।

দুই:

ভূল করে সারা রাত্রি বাইরে মেলে রাখা হিমের চাদরের মতো শেষরাতের রাস্তা ক্রমশঃ পায়ের সামনে জমিয়ে রাখতে থাকে নিচু নিচু পাহাড়। স্ট্রেইট ডাউন যাইয়ে, ছাড়িয়ে একটু এগোলেই ডানদিকে থাকে থাকে সিঁড়ি উঠে গ্যাছে দ্যাখা যেতে থাকে আর আরও অনেক সামনে অন ইওর লেফট সাইড ইউ উইল ফাইন্ড দা বোর্ড ব’লে মাথায় সাদা কাপড় জড়িয়ে নিয়ে আগে আগে হেঁটে যেতে থাকে নরম নরম রাস্তা। তখনো ভোর হয় নি ব’লে তার রঙ মনে হতে থাকে বাষ্পের মতো হলুদ অথচ একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব পেতে পারেন ব’লে সঙ্গে দু’একটা হাল্কা গরম জামা বা উইনচিটার রাখা ভালো।

তিন:

পাথুরে চাতালের মতো ছড়ানো রোদ্দুর পেরোতেই ভেসে আসে তিব্বতী গুম্ফার আদল আর অজানা বাদ্যযন্ত্র ও গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণের সমবেত স্বরগুলি মনে হতে থাকে মৃদু চোখে প্রাণপণ ছুঁয়ে আছে দূরবর্তী পাহাড়ের ভিজে ভিজে বাঁক। তাদের কাঁধে ও মেরুন পোষাকে ঝুরো ঝুরো তুষারের স্মৃতি নিয়ে বাধ্য বালকের মতো ঠা ঠা রোদে ছোটাছুটি করতে থাকে থাকে থাকে পুরনো পুঁথি ও থাংকার হল্দে হয়ে আসা ভঙ্গুর বিবর্ণতা আর বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গগুলি বৃদ্ধের মুখ থেকে আবছা গল্পের মতো বেরিয়ে এসে একে একে ঝুলে থাকে ফ্রেমে বাঁধানো ছোটো ছোটো দেওয়ালে। অথচ একটু দূরেই অগভীর জলে পায়ের পাতা ঈষৎ ডুবিয়ে শ্যাওলাঢাকা নিশ্চিন্ত পাথরেরা অদৃশ্য হাতিদের পোষমানা শিকলের শব্দে মগ্ন হয় প্রেমে ও পিকনিকে আর তাদের ঠান্ডা হাওয়া ও বুনো আমের গন্ধ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে গুম্ফার ছবিতে যেখানে চারজন আকাশপ্রতিম দেবতা তাদের সোনার অঙ্গে মেখে নেয় ভ্রমনপিপাসু মোমবাতিদের বিষ্মিত চোখ আর খুলে রাখা জুতো।

চার:

বিকেল নাগাদ জলপ্রপাত চলে যেতে পারেন ঠিক শহর ছাড়িয়েই যেখানে ঢালু হয়ে নেমে গ্যাছে কফিক্ষেত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত গোলমরিচের ঘ্রাণ আর মৃদু মৃদু ফার্ণেদের শরীরে জলকণা জমে থাকা আঙুলের ঈষৎ ছোঁওয়াতেই ঝরে পড়ছে টুপ্ টুপ্ মাটি ও পুরনো পাতায়। কাফি-টি-কোলডিঙ্ক আর সিগারেটের দোকানে জড়ানো হাল্কা গেটের মতো বিজ্ঞপ্তি পেরোলেই দেখা যাচ্ছে ধাপে ধাপে সিঁড়ির মতো পা নেমে গ্যাছে বহু নীচে আর পড়ন্ত জলের শব্দে সেখানে লোহাটে ব্রীজের উপরে ঝুলে রয়েছে ভারী শ্যাওলার মতো মেমটুপিদের গান ও গল্পগাছা। ব্যাস্ এখানেই এরকম বসে বা দাঁড়িয়ে থেকে ইতস্ততঃ ঘুরে দেখে নিতে পারেন জলেদের প্রকাশ্য চান ও পাথর, আর সটান বৃক্ষসকলের জলছবি আলোয় আপনি চুপচুপে গেলে বুঝতে পারবেন স্থানীয় ড্রাইভারের চোখ এবারে চেপে বসবে উইন্ডস্ক্রীনের সরু সরু অন্ধকার বাঁকে। রোজকার কুয়াশার পাশাপাশি তার টায়ারের দাগ ঝুঁকে ফিরবে শহরের দিকে আর সিনেমার গানের সঙ্গে তাল দিতে থাকবে লাল-কালো স্টীয়ারিং-এর খুশী খুশী শিস্।

বাবার মৃত্যুদিন ও অবিন্যস্ত সময়গুলি

Thursday, March 8th, 2007

বাবার মৃত্যুদিন ও অবিন্যস্ত সময়গুলি
[2003]

বাবার মৃত্যুদিন - সময়: সকাল

ভোর হলো। আর আকাশ উঠতেই দেখা গেলো তার গায়ে গরম ইডলির মতো ধোঁয়া ওঠা সাদা সাদা দাগ। চোখের পাশে জমে থাকা গতরাত্রের বাসি শ্রমের রঙ তখনো রক্তের মতো ঘোলাটে সাদা। দূরে কোথাও সত্যি সত্যি ঘন্টা পড়ছে, গীর্জা হতে পারে। ঘড়ি পরি নি বলে সময় মেলানোর কথা মনে পড়তে চোখ রাখি রাস্তায়। পৃথিবী সুবিধাজনক ভেবে আমরা এখন সুখী হয়ে উঠতে শুরু করেছি। দারুণ!

বাবার মৃত্যুদিন - সময়: দুপুর

সময় এখন রাতের মতো গাঢ় হচ্ছে। গলে যাচ্ছে; যেভাবে চ্যাটালো রোদের সাথে ছোঁয়াছুঁয়ি খেলে ক্রমে গলে যায় পীচ। যাবতীয় চাকার অবশ্যম্ভাবী বৃত্তগুলি কি এক আশ্চর্য নিয়মে সরল রেখা হয়ে উঠছে আর উঁচু ক্ষতচিহ্নের মতো অসংখ্য দাগ রেখে যাচ্ছে এলোমেলো বিজ্ঞাপনে দেখা টায়ার কোম্পানীর হাসি হাসি মুখে। দূরে কোথাও যাওয়ার কথা হচ্ছে। ভোঁ বাজলেই সটান - চাকা ও দাগ নিয়ে ছুটে যেতে হবে। তর্জনী ছুঁয়ে থাকবে পৃথুল সূর্যকে। যেন ট্রাম, গতিপথ নির্দিষ্ট।

বাবার মৃত্যুদিন - সময়: বিকেল

এ মুহূর্তে রাস্তা দেখার কথা। চোখ ও চামড়া দিয়ে আমাদের গতিবিধি বুঝে নেবার কথা। সামনে হলুদ আলো, গোল গোল, চ্যাপ্টা ছাতার মতো হতে গিয়েও মনে পড়ে যায় আমাদের এখন ফেরার কথা আছে। আমাদের প্লাস্টিক, বাজারের ব্যাগ, হাওয়া ও রাস্তার মধ্যেই আওয়াজ করতে থাকে। নাভিহীন পেটের মতো পাঁচরাস্তার মোড়ে দাঁড়িয়ে থাকে আমাদের সারি সারি কবজির হাড়। মাংসও। চামড়া চোখে লাগিয়ে নিই। আমাদের না ধোওয়া টিফিন বাক্স জুড়ে এখন শুধু ঘরে ফেরার তাড়া।

বাবার মৃত্যুদিন - সময়: রাত

চোখ তাকাতেই চোখে পড়ে হাড়। ঈষৎ ছাইয়ের মতো। হালকা মাটি ও মানুষ গন্ধ চোখের সামনে ভোরের ধোঁয়ার মতোন লেগে থাকে। আমার মাথা আর অন্যান্য মাংস জুড়ে গন গনে লাল হয়ে ওঠে ধূপকাঠি, ফুল ও জল, আজে বাজে খাট। অগুরু ও আতর পোড়ে; চক্ররেলের পাশে বসে থাকতে থাকতে গড়ে ওঠে স্কুলগেট, ভোরের বাস। ট্রামরাস্তা পার হয় একটি পুরুষ আঙুল।