Archive for the ‘আমার লেখালিখি’ Category

একটি গঠনমূলক নির্মাণ

Thursday, April 24th, 2008

একটি গঠনমূলক নির্মাণ
[২০০৮]

২৭শে জুলাই ২০০৭: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমি, পোড়ো ও প্রস্তর, সেদিক পানে চাইলে বিকালে ও সকাল-সন্ধ্যায় খুব কলরব হয়। কাহাদের অটোকথায় দেখা যায় চামড়া ও রেক্সিনের তেলমোটা রঙ আর নারিকেলবীথি মাঝে লাল-কালো সুর্যাস্তের ক্যালানে ক্যালেন্ডার; কখনোবা হাতেআঁকা নায়িকার বিহ্বল বুকপাছার আশ্চর্য অনুপাত; কারো কারো প্রিয় ডাকনামগুলি; টা টা ওকে হর্ণ প্লিজ; দৈবাৎ বুরি নজরবালা কালা মুখের সচিত্র বিবরণ ও গ্রামীন ব্যাংকের অসীম বদান্যতার কথা। অবশ্য অন্য সময়, যেমন ভো্রে কিংবা শিশুরাতে, সেখানে বাসা বাঁধে কতগুলি পলিথিনজল পরিবার, তাদের অ্যাসবেসটস গেরস্থালীর ঘরোয়া রোয়াব আর স্খলিত ঝামঝগড়ার ঝংকার।

২৭শে মে ২০০৮: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমির উপর নিখুঁতপ্রায় ডাইনোলোহার দাঁত, নবীন ও মুখর, সেদিক পানে চাইলে সকালে ও দুপুরে-বিকেলেও খুব কলরব হয়। ধাতুশব্দে শব্দরূপ শব্দের রূপ পেলে, কাহাদের হাত ও মেশিনবর্তী অঙ্ককাহিনীর জেরক্স জুড়ে দেখা যায় ছোটোবড় কাঠামযাপনের বিজ্ঞপ্তি বিলি হচ্ছে উঠোনে জানালায় আর ইস্পাত সাফল্যে মেদিনীর পুর থেকে তুলে আনা হচ্ছে মাটি ও মদ্যের ঘনঘোলা মিশ্রণ ; তাহাদের ব্যক্তিগত নদীসামগ্রীর ধাতুকলেবর। অথচ অন্য সময়ে, যেমন ভোররাত বা সন্ধ্যার ঝোঁকে, সেখানে সেয়ানা কংক্রীট কাঠের দোহাই দিয়ে নৈঃশব্দ শুয়ে থাকে গোটানো ঘামের ঘ্রাণনির্মাণ আর হলদে বাল্বে ঢাকা ফাঁকা প্রতিধ্বনিমৃদু এক চল্লিশোয়াট সাইক্লপ।

২৭শে মার্চ ২০০৯: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমি থেকে উঠে যায় ধাপসিঁড়ির পোষা সাপ, কালো ও শীতল, সেদিক পানে চাইলে সকাল-বিকাল আর সন্ধ্যেবেলায় খুব কলরব হয়। ফুলটবের বাহারে, ছেঁড়া হাওয়ার টুকরোগুলিকে টাঙিয়ে রাখলে করিডরমহলে দেখা যায় ছোটোবড় সাইকেল জমেছে কাহাদের পাপোষে গণেশে আর ঘরে ঘরে বারান্দাদরোজার পিতলে গাঁথা হয়েছে টিভি বিজ্ঞাপনের বাঁকানো উঠোন ও নাচতে নাজানা রমনীগণের আমরণ অনশন অনিদ্রার কথা। ফলতঃ অন্য সময়ে, যেমন মধ্যরাতে ও চাতালদুপুরে, সেখানে ছোট ছোট বাক্সগুলি থেকে বেরিয়ে আসে ঘুলঘুলিঘষা ভেজা মেঘ আর তাদের ন্যাকাটে আব্দারঘেঁষা ছাঁকনিগুলির ফিস্‌ফিস্‌ শ্বাসধনি; ঘুরন্ত এসিপাখার আবছা ঘুন ঘুন।*

—————————–

* লেখাটি প্রকৃতপক্ষে লেখা হয় এপ্রিল ২০০৮-এ যখন পুরনো ফোল্ডার ঘাঁটতে ঘাঁটতে ২৭শে জুলাই ২০০৭-এর একটি লেখা পাই, যা কিনা, আমার থাকার জায়গার পাশে পড়ে থাকা একটি ফাঁকা জমির দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়ে লেখা, যে জমিটি, সেই সময়ে অর্থাৎ ২০০৮-এর এপ্রিলে, একটি নির্মীয়মান ফ্ল্যাট ইমারতের আদল নিয়েছে। এইসময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমি গদ্যাংশটিকে পুনরায় লেখার চেষ্টা করি, তখন দেখি লক্ষিত বস্তু বদলে যাওয়ায় তার প্রতিচ্ছবিও স্বাভাবিক বদলে যেতে শুরু করেছে। এবিধ আবিষ্কারে আমি পুলকিত হয়ে লেখাটি নতুন করে লিখতে প্রবৃত্ত হই এবং একটি ফাঁকা জমির সামান্য অতীত, দৈনিক বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যত নিয়ে একটি লেখাই তিনবার লিখি তিনটি প্রায়-কাল্পনিক তারিখে, যেগুলির মধ্যে সচেতনভাবে রেখে দিই এক একটি দশ মাসের পোয়াতি ব্যবধান।

বালিকার জন্য চিরকুটগুলি

Saturday, April 12th, 2008

বালিকার জন্য চিরকুটগুলি
[২০০৮]

চিরকুট ১

এখন সন্ধ্যে নামার আয়োজন অ্যাসফাল্ট শহর জুড়ে এক অটোমোবিল কনসার্ট এখন প্রস্তুতিপ্রান্তে দাঁড়িয়ে ঢিক্‌ ঢিক্‌ সাউন্ডচেকের তালে তালে হাল্‌কা কোমরদোলানি। ফলতঃ অসংযত সকালের টানা দুপুর পেরিয়ে এ পড়ন্ত বিকেলভূমিতেও যে বালিকাটি লঘুপদে ছোটাছুটি, অহংকারী ভ্রূ-রেখা ও জেদী গ্রীবার বাঁকে এসে সেও একটি হলুদ নাকছাবি ক্রমে অ্যালবামে ও জানালায়।

চিরকুট ২

পাশাপাশি দু’একটি হরফ ছুঁয়ে ফেলতেই শব্দ হারিয়ে যায় ও যা নেমে আসে তা বৃত্তবৎ মুখের হলুদে একটি সার্বজনীন হাসি ও লাল জিভের বাঁকা দাগ। বাকীটুকু বিন্দুবৎ, শুধু কী-বোর্ডের খেলা। এভাবেই আজকাল কথোপকথন হয়, পাঁচ বা সাত খন্ডে।

চিরকুট ৩

কিছু কিছু অস্থিরতা হয় যাদের নাম হয় না ও চেহারাও পরিচয়হীন। সন্ধ্যে সিরিয়ালের ফাঁকা বাতাসে কোনো মুখরা বালিকার ছবি ছেপে এলে শুধু তাদের অবয়ব চোখে পড়ে। আবছা, ফলতঃ অনুসঙ্গহীন।

চিরকুট ৪

তখন ট্রামরাস্তা, দুপুরের ঝিম ফাঁকা বাসের সীটেও পরানো থাকতো জাদুজুতোর হাততালি আর হুশ্‌ বলতেই পৌঁছে যাওয়া যেতো বউবাজার থেকে পার্ক স্ট্রীট; শ্যামবাজার, গোলপার্ক, বরানগর, এন্টালি হয়ে কলেজচত্বরে। পালক ও চামড়ার ডানাগুলি ফুটবোর্ডে, মেট্রোমহলে সারি সারি সাজানো থাকতো যেন কতগুলি জিন্‌সের হাঁটু; এখনি শাট্‌ল ট্যাক্সির পেছনের সীটে বসে গুছিয়ে নেবে নিজেদের প্রাপ্য জায়গা, গুঁতো। এক চরকিবাজির গপ্পো শুনে আজ হঠাৎ এইসব মনে পড়ে।

চিরকুট ৫

অক্ষরগুলি আঙ্গুল ছুঁতেই এক একটি বুদবুদ শান্ত স্ক্রীনজলে কাঁপন তোলে আর এক একটি ‘ডিং’ শব্দে সারাদিন লা লা লা। কথাচ্ছলে এইসব খেলা জমে, অক্ষরে অক্ষরে। (যেন) পরিত্যক্ত রানওয়ে শেষে দেখা যায় একটি সাইকেল, আইসক্রীম বাক্সের গায়ে হাতেআঁকা লালফ্রক, বিনুনির ছবি।

চিরকুট ৬

ধরো একটি ভ্রূ-কুয়াশায় হাত পাততেই চারিদিকে অক্ষরের জাদুঘর। আর চটিচ্ছলে গলিয়ে নিচ্ছো বলে ধরে নাও কোনও অচেনা লাল রোয়াক; অনেকগুলি গাছপাথর পেরিয়ে আসা লেকবিকেলের বাদামকোলাহল; তোমার ও তোমার উৎপলদার ব্যক্তিগত লিখনভঙ্গিমাও। আসলে তোমার এখন কোথাও যাওয়ার কথা নেই ;-) । তোমার তালুতে মুঠোতে এখন এক বোতামআঁটা ম্যাজিকবাক্স খোলা।

কিচাইনগাথা

Sunday, March 16th, 2008

কিচাইনগাথা
[2006]

কিচাইনগাথা: এক

এইভাবে ক্লিক্‌ফাঁদে দীওয়ানা হলে সত্যিই বড় ঝট্‌কা লাগে এসকল নেটযাপন, যেখানে নখাগ্রে ঝিলিক দেয় তামাম দুনিয়া আর মুখ ও মুখের বিকল্পে মুখোশ ও মুখোশেরও বিকল্পে পুনরায় অন্য মুখের ভীড়ে উড়ে যায় আমাদের সামাজিকতার টুপি ও খোলাচুল এই মেঘবন্দরে ছেয়ে যায় চামচা আকাশ। আমরা ভালো থাকি অথবা এভাবেই দাবী করি আমাদের ভালো থাকার সম্ভাবনাসমূহ সুতলিবদ্ধ পুত্তলিকাবৎ হাতে কাপড়ের তলোয়ার আর রাংতার মাথামুকুটে নাচতে থাকে গোপন ইশারার মতো রাষ্ট্রযন্ত্রের অনর্গল তাগিদে। অথচ দ্যাখো, এই প্রাঙ্গনে যেন অন্য কথা ছিলো, কথা ছিলো এবারে আমরা সকলে সিনেমা দেখবো পর্দার উলটো পিঠে আলোকিত থিয়েটারহলে সেইসব চাপা ও কৃষ্ণবর্ণ ছবিগুলি, মানুষের নজর থেকে বেরিয়ে আসা সাদা হলুদ বা কমলা কোনো রোদ না পেয়ে যেগুলি এখন শুকনো ও পাটল। এরকমই যেন কথা ছিলো তবে কার কথা কে ও কবে দিয়েছিলো সে প্রশ্নে এমনকি এ দামড়া আকাশব্যাপী আমাদের নিরন্তর তথ্যযাপনেও কোনো উত্তর থাকে না। ফলে এ চামচক্রান্তে যোগ দেয় প্রযুক্তিস্নেহ, আর মোয়া আসে চমৎকার, জনপ্রতি এক বা দুই, দিগন্ত জুড়ে দেখা যায় আমাদের হাসি হাসি মুখ, যা কিনা ঘন ক্লোজআপে কিছুটা কৃতার্থ করজোর তেলতেলে শব্দেঘেরা সেই হারামী ভাস্কোর জাহাজের পোঁ শোনা থেকে।

কিচাইনগাথা: দুই

জামার হাতা গুটিয়ে কনুইয়ের উপর তুললেই চামড়া কিছুটা সাদাটে ও ফ্যাকাশে যেন রোদ না লাগায় রংগুলি হারিয়ে গ্যাছে ইঁটচাপা ঘাসে। ফলে বারংবার মনে হয় আমরা সকলেই প্রকৃতপ্রস্তাবে ফর্সা ও কর্কটক্রান্তির চড়া রোদে কিছুটা তামাটে মাত্র ভাগ্যদোষে। এবিধ চিন্তা এলেই তৎক্ষণাৎ মেরুদন্ড বেয়ে শির শির ওঠানামা করে চামড়া ও ঘামের রঙসংক্রান্ত এ সুপ্রাচীন ছেনালীগাথা, রূপোর মোড়কে যার চাবুক থেকে সাবানের ফেনা ঘষে উঠে আসে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর প্যাকেট ও তার সাদা আদিখ্যেতার চিট্‌চিটে ঘাম। আমাদের কেল্‌টি চামড়া লোভী অথচ পোষা ফলতঃ লালায়িত কুকুরের মতো বারবারান্দায় বাতিল ডগবিস্কিট খায় গুটোনো লেজ নাড়ে আনুগত্যে ভারী হয়ে ওঠে তার রোঁয়া ও চেনবকলেস আর এ অবশ্যম্ভাবী মেলানিনচক্রের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে যেন কোনো রুগ্ন বেশ্যা সন্ধ্যের ল্যাম্পপোস্টের নিচে সস্তা প্রসাধনের রিবেটে মুছে ফেলে নামধাম, তার বাড়ির ঠিকানা। এ চামচেতনায় বিষাক্ত পাখির ছায়া বাসা বাঁধলে গোপন ছুরির মতো আস্তিন থেকে বেরিয়ে পড়ে বাণিজ্যজাহাজের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে রাখা সাদা স্বভাবগুলির সোনালী হারামিপনা ও পিজারোর নাম লেখা বোতলবন্দী চিঠি ও সনদ, যা দেখে আমাদের চামড়ার বয়স কেঁপে ওঠে মোমবাতির ছিবড়ের মতো পড়ে থাকে শুধু আমাদের লেহনলিপ্সা, আমাদের চামচেতনা, ভয়।

কিচাইনগাথা 1 - 10

ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ ও ঝুপো গোঁপেদের গল্প

Saturday, March 15th, 2008

ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ ও ঝুপো গোঁপেদের গল্প
[2007]

প্রথম অধ্যায়

সাঁঝের ঝোঁকে ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপের চিল্‌তে বারান্দাবারে ডিগবাজি খায় ঝুপো গোঁপগুলির বাগানো বাগান আর টেবিলের বাদামবিন্যাসে দেখা যায় কুটি কুটি দু’একটি ইংরিজি শব্দ পড়েছে টি-শার্টের কালোতে লেখা হয়েছে মিস্টার লেননের চশমার খোপকাটা গালিচার কথা। এখন ঝুপো গোঁপেদের বাগানো বাগানবারের বারান্দায়, চুপচাপ চাকুর মতো চমৎকার চিন্তা চুষে, আমাগের চেতনার চিতাবাঘ বীয়ার গেলে ইংরিজিতে এবং কথা বলে যেমত অনর্গল তা-ও ইংরিজিতে।

দেখে বোঝাও যায় না ক্যালাকেলি হয়ে গেছে, বহু আগে, গোপনে, কিছুটা বিপ্লবের ঢং-এ।

দ্বিতীয় অধ্যায়

অথচ কি বিকেল কি সন্ধ্যেয়, হাজার গান গাইলেও আজকাল আমাদের ছাদে কেউ বসে বসে কাঁদে না বরং কান্নার কথায় আমাদিগের পেছন ভারী হয় ও খুদে বারবারান্দার টিনসাইনে ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ লেখা হলে সিগারেটের ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠার বদলে নীচে নামে। পানশালার সামনে হিসি করলে ভাড়াটে পেয়াদার হাতের থাবায় এক মুহূর্তে আমাদের সকলের নাম হয় শ্যামলবরণ আর আমাদের বর্গক্ষেত্রগুলি গোনাগাঁথা হয়ে যায় এ রাতের কথায় দাগচিহ্নে হিসেব রক্ষিত হয় আমাদের নামের পাশে টিকমার্কে লিখে রাখা হয় সালতামামি ও ক’ বলে ক’ উইকেট এহেন দুর্বোধ্য সব ডাটা।

আর নেপথ্যে পোস্টার পড়ে এই মর্মে যে সব কিছুই হে কমরেড বিপ্লবের স্বার্থে।

পেম ও পোতিগ্গা

Saturday, March 15th, 2008

পেম ও পোতিগ্গা
[2007]

এখানে খুলির সামনে সকলেই কৃষ্ণাঙ্গ প্রেতাত্মার গান শোনে ও বড় হয়। তাদের কেল্‌টি চামচাদরে স্টিকার লাগে ঝিকিমিকি আর কেন্নোবাতাসে আমাদের রোঁয়া ওড়ে ফুর-ফু-র ফুর-ফু-র, যেন ফুলকো বিকেলের কোনো শহরে বা দেয়ালে লেগে থাকে আমাদের বালছাল, পেম ও পোতিগ্গার মুহূর্তে করা আমাদের দু’একটি নৃশংস পোস্টারের স্কেচ ও তাদের বারবেলার গ্রাফাইট।

ফলতঃ এ কেলে কেলে পেম-পোতিগ্গার হাবলা নাদানিতে মলমের বেওসা জমে খুব আর টিভিতেও বিজ্ঞাপন সিনেমাতে ও কাগজেও দ্যাখা যায় পেম ঝরছে চাদ্দিকে, পোতিগ্গায় ভরে যাচ্ছে আমাদের কালোকুষ্টি ইতিহাসের পাতা।

কয়েকটি ছোটো গল্পের একটি ছোটো সংকলন

Saturday, March 15th, 2008

কয়েকটি ছোটো গল্পের একটি ছোটো সংকলন

একটি ছোটো গল্প ও তার পাঠসহায়িকা
[2007-8]

ছোটো বাজারের মাঝেই লেডিস বিউটি পার্লার। রোগা মেয়েটির হাতে কাজ থাকে কম। তাই সে নিজেই নিজের চুলচূড়ায় মাথা বেঁধে ফ্যালে রোজ সকালেই। আর আয়নার লেপ্টে থাকে তার লাল জামার দাগ।

————
12/1/2007 তারিখ সকাল 11টা 38 মিনিটে জেবতিক আরিফ তাঁর পাঠসহায়িকায় বলেন:

আলোচ্য গল্পটি ছোটো হলেও অত্যন্ত জটিল একটি গল্প। এখানে লেখক ব্যাপক সামাজিক প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। প্রথম শব্দ ‘ছোট বাজার’ পড়ার সাথে সাথেই আমরা বুঝতে পারি কোথাও না কোথাও একটি বড়ো বাজারও আছে। এইযে, বড়ো বাজারের কারনে, উল্লিখিত বাজারটির ‘ছোট বাজার বলে পরিচিত হয়ে ওঠা, প্রকৃতপক্ষে বাজারে বাজারে শ্রেনী বৈষম্য এবং মুক্ত বাজার অর্থনীতির অসারতা প্রমানে লেখকের একটি স্বার্থক চেষ্টা।

আপাততঃ গল্পের প্রথম শব্দবন্ধটি নিয়ে আলোচনা হলো। এভাবে প্রতিদিন একটি করে শব্দের ওপর আলোচনা হবে। যারা এটিকে ছোট গল্প হিসেবে বেশী ছোট ভাবছেন, তাদের তখন মনে হবে পৃথিবীর অন্যতম প্রধান একটি ছোটগল্প পড়ছেন। সুতরাং হতাশ হইয়েন না।


সান্ট্রোবালা - আলটোবালির গল্প
[2007]

একটা গল্প লেখার কথা ভাবি - সান্ট্রোবালা আর আলটোবালির গল্প। সান্ট্রোবালা খুব ঝিংকু, আলটোবালির চামকা গতর। সান্ট্রোবালা রোজ সকালে লেজলোপাটের পেন্টু পরে, আলটোবালির ছাপুর ভাঁজে কলমগোঁজা। সান্ট্রোবালার দুধপরিজে কফির ছানা, আলটোবালির রসের ভাঁড়ে কমলানেবু। রোজ দুজনায় রোদ বিছানায় সকাল কাজে কাল্‌টি মারে আর সান্ট্রোবালার নেংটি ওড়ে ব্যালকনির দড়িতে; আলটোবালির চুলের নুটি হাওয়ায় চড়ে হাওয়া হয়ে যায় নিচতলার উঠানে। মাঝে মাঝে দিল মে টিং টিং ঘন্টি দিলে এফেম বাজে। তখন সান্ট্রোবালা আলটোবালি লিফ্‌টলতিকায় দেওয়ালমুখে কনুই মারে আর বেসমেন্টে ধাক্কা খেলে কায়দা করে আগুপিছু হয়। চিৎচাতালে খুট খুট ক’রে আগে যায় আলটোবালির জুতি আর পেছু পেছু খট্‌ খট্‌ সান্ট্রোবালার জুতো।

তারপর, দুজনে দু’দিকে চলে যায়। সান্ট্রোবালা তার সান্ট্রোতে আর আলটোবালি, আলটোতে। তাদের কনুইগুলি আবার লাইন মারে সেই সন্ধ্যে হলে, তবে।


সাদা মার্বেল কালো পরী
[2007]

গেরামের ঠিক মদ্যিখানে মস্ত দিঘি। জল টলটল বৈকেলে সেকেনে রাজ্যির মদ্দা মাগী, দিঘির পাড়ে উবু হ’য়ে, জলে ন্যাজ ডুবিয়ে বস’ থাকে। রাঙাপিসোও সেকেনে রোজ নেশার মতো। মাজেসাজে আবার ন্যাজের ডগায় কোঁচানো উড়নি; রিবন দিয়ে ন্যাজে ফুল বেঁধে রাঙাপিসিও সেদিন সঙ্গে সঙ্গে যায়। যেতে যেতে ব’লে, আ মোলো যা, বুড়োর ঢং দ্যাকো! বলি ন্যাজে সদ্দি হ’বে যে!

গেরামের ঠিক মদ্যিখেনে মস্ত একটা দিঘি আর সে দিঘির পাড়ে বৈকেলবেলায় ন্যাজ ডুবিয়ে ব’স থাকাটাও এখেনে অনেকদিনের রেয়াজ।


পেমপত্ত
[2007]

পিংকিরানির বয়স ষোলো আর পিংকুবাবুর সতেরো। ফলতঃ পিংকিরানির গোলাপী ফিতেফ্রকে পিংকুবাবুর কেস বেশ খারাপ হয়ে যায় রোজ সন্ধ্যেবেলার টিউশানি হাওয়ায়। পাতলা গলিতে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পিংকুবাবুর হাঁটু খুলে গেলেও ডিউটিতে কামাই থাকে না আর ফিলোজফিফেরৎ এসব দেখে পিংকিরানির ঢিবিতে ঢিবঢিব হয় খুব।

এমনই চলতে থাকে রোজ রোজ, কিন্তু বেস্পতিবার মাস্টামশায়ের বউয়ের লক্ষীপাঁচালি আর ইন্ডিয়ার ম্যাচ একইদিনে পরার ফলে, পিংকুবাবুর অংক ক্লাস ছুটি হয় তাড়াতাড়ি আর গলির মুখে নালার পাশে ঘাপটি মেরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয় ঘন্টাখানেক এক্সট্রা। তার উপর যাওয়ার পথে কোচিং-এর ফালতু পার্টি হালকা হ্যাঁটা দিয়ে যায় - ‘দেওয়াল ধরে দাঁড়িয়েচিস তো পিংকু? দেওয়াল ধরে দাঁড়া! দেওয়াল ধরে দাঁড়া!’ ফলতঃ সেদিন পিংকিরানি ফিলোজফি শেষ করে বেরোতেই পিংকুবাবু দড়াম্‌ করে সামনে দাঁড়ায় ও আচমকা একটি চোতা ধরায় তার হাতে। আর সেই চোতা-ধরা হাত ধরেই ধরা গলায় বলে ‘আমার পেমপত্ত! তোমাকে! ইয়ে পিংকি, আমি না .. আমি না .. আল্লা ভিউ পিংকি!’ নিশ্চিন্ত পারাবতযূথমধ্যে এবিধ হুলোবেড়ালের আকস্মিকতায় মেয়েরা চিলুবিলু করে ওঠে। পিংকিরানিও স্বভাববোধে। উত্তেজনা বা খুশিতেও সম্ভবতঃ। কলোনীর ধোঁয়াজড়ানো ছ্যাবলা অন্ধকারে আর কিছুই দেখা যায় না। ফলে গলতা থেকে হুড়মুড়িয়ে বেরোনোর সময় মেয়েরা যে হালকা হল্লা তোলে, তাতে স্যামলদা স্যান্ডোম্যানের বিবেক জেগে উঠলেও সে এসকল হাঁড়ির খবর কিছুই জানতে পারে না।

গলির ভেতর তখন হাবা গণেশের মতো দাঁড়িয়ে থাকে পিংকুবাবু। দেওয়াল ধরে বা না ধরে। পানসে বাতাসে পৎ পৎ উড়তে থাকে পিংকিরানির ফেলে যাওয়া পিংক ওড়না। আর পিংকুবাবুর পেমপত্ত। তার পিংক ফ্লুরোসেন্ট।

খুন শব্দে শব্দের খুন

Saturday, March 1st, 2008

খুন শব্দে শব্দের খুন
[2007]

এক সহৃদয় মানুষের কাছ থেকে শব্দ খুন করার কায়দা শিখে নিতেই - আর্তনাদ শুরু হয়; কী-বোর্ডে ও সেই হেতু স্ক্রীনেও। বোঝা যায় অলরেডী আতাক্যালানে দুটো-চারটে শব্দরা খুন হচ্ছে এ’পাতা ও’পাতায় আর বাওয়ালবিধির ব্যাকরণ বইয়ে বানানবিধির বাওয়ালী হ’লে, শব্দের ন্যাড়া লাশে ভেসে যাচ্ছে ভাষা ও নোটবই, তার ক্যাবলা আকাশ। ফলে, অনেকেই খুন চাইছে খুন শব্দে শব্দের খুন, খুনী বোতামের মতো, খট খট খট খট - শব্দের ব্যাকস্পেসে খুনী শব্দের খুন করছে বেছে বেছে।

সে শব্দে আসলে শব্দের খুন। সে শব্দ আসলে শব্দ খুনের শব্দ।


এই লেখাটি স্বাধীন নয় ও অনেকটাই পূর্ব প্রসঙ্গের উপর নির্ভরশীল, যে প্রসঙ্গ আবার এ প্রসঙ্গে অপ্রাসঙ্গিক। লেখাটি কোনো এক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে লেখা, যেখানে ভুল বানানের শব্দগুলিকে খুন করে, তাদের জায়গায় ঠিক বানানের শব্দগুলিকে আনার কথা বলা হয়েছিলো। চরিত্র নয়, লেখাটির গঠনটি ভালো লেগে গেছিলো বলে এটি জমা পড়লো এই লেখালিখির খাতায়

তাৎক্ষণিক তাৎপর্যমন্ডিত ও পূর্বানুসঙ্গনির্ভর এই লেখাটি আদিতে লেখা হয়, সামহোয়্যারইনব্লগে ‘একটি বাংলা ব্লগকথায়’ , 2007 সালের 8ই মে তারিখে। দুই চারিটি কাব্যময় মন্তব্যের সহিত আদি লেখাটি পড়ার জন্য ক্লিক করা যেতে পারে এখানে

হাতের লেখা

Monday, January 28th, 2008

ডাকে কিছু কবিতা এলো। ফুলস্কেপ কাগজে লেখা হাত ও কলম। ঘোরানো ঘরোয়া শব্দের মাথাগুলি গোল হয়ে উঠে বা কখনো নেমে, পরষ্পরের কাঁধে কাঁধ ঠেকিয়ে, যেন ভাঁজ করা পাতার এলোপাথারি মাঠজুড়ে সাঁওতালি নাচ জমেছে খুব চাঁদের আলোয়। মাঝে মাঝে কিছু দর্শনার্থী, ট্যুরিস্ট লালে লেখা হেড লাইন, দিকনির্দেশ, সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

এসব দৃশ্য দেখে ছোটোবেলার সেই হাতের লেখার কথা মনে হয় যে রোজ বিকেলে গল্প করতে আসতো সান্টুদের বাড়িতে আর সন্ধে হলে রুলটানা খাতার বারান্দায় বসে ঢুলে ঢুলে নামতা পড়তো চাপাসুরে। ছোটোবেলার ঠিক পরের বেলায়, যেদিন ‘স’ ‘জ’ ও ‘ম’ লেখার কায়দা বদল হয়, সেদিন এই ছোটোবেলার হাতের লেখা খুব দুঃখ পায় ও সারারাত অঙ্কখাতার পেছনের রাফ করার পাতায় বসে বসে মিহিসুরে কাঁদে। পরদিন সকাল থেকে তাকে আর দেখা যায় নি, শুধু একবার ছাড়া। তখন মেজোবেলার হাতের লেখার রমরমা। তার ঠাট কায়দায় ছোটোবেলার হাতের লেখার কথা মিলিয়ে যায় অচিরেই।

এর অনেকদিন পরে, যখন বড়বেলার হাতের লেখাকে আনুষ্ঠানিক বিদায় জানিয়ে হাতের লেখার বাড়িতে প্রবেশ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয়, তখন, ইনফ্যাক্ট তখনি শুধু একবার, ছোটোবেলা, মেজোবেলা ও বড়বেলার তিন হাতের লেখাকে পরষ্পরের গলা জড়িয়ে ধরে হাউ হাউ করে কাঁদতে দেখা যায়। সেই শেষ। তারপরে তাদের কাউকে আর দেখা যায় নি।

আজ ডাকে আসা কবিতা দেখে তিনজন হাতের লেখার কথাই মনে পড়ে বার বার।

লেখালিখির খসড়া

Saturday, September 29th, 2007

লেখালিখির খসড়া
[2007]

1.
মায়ের জন্মদিন মনে নেই। বাবার জন্মদিনও। একটু ভাবতে, বাবার মৃত্যুদিনও মনে নেই, শুধু এইটুকু মনে পড়ে। তবে মনে পড়ে, নিজের জন্মদিন মনে আছে। নেতাজীরও।

2.
একবার ভালোপাহাড় গেসলাম। সেখানে রাত্রে খুব জোসনা পরেছিলো। আর মহুয়া। আর হিম। বাগানে একটি রূপসী লেবুগাছ ছিলো যে সত্যিই একটি লেবুগাছ ছিলো। আমি ঠা ঠা চাঁদের নিচে দাঁড়িয়ে তার পাতায় পাতায় তিনটে-পাঁচটা চুমু খেয়েছিলাম। সব গাছেদের সামনেই। খুব সুখ হয়েছিলো। আমার তখনকার স্ত্রী ও প্রেমিকা সেসময় ঘুমুচ্ছিলো। ঘরে। তারা মানুষ ছিলো।

দুঃখজনক লেখাগুলি

Thursday, September 27th, 2007

দুঃখজনক লেখাগুলি
[2007]

1: মার্চ 2007

হৃদ মাঝারে রাখবো ছেড়ে দেবো না ক্ষ্যাপা গান গায় ও ভুল শোনে ক্ষ্যাপা গান গায় ছেড়ে দিলে সোনার গৌর আর পাবো না আর তাই ক্ষ্যাপা গান গায় না না ছেড়ে দেবো না আমার হৃদয়ে রাখবো ছেড়ে দেবো না আসলে কোনো কিছু হৃদয়ে রাখা যায় না কারণ কতিপয় সুনির্বাচিত মাংসপেশী ব্যতীত হৃদয় বলিতে কিছু নাই ও এবম্বিধ যাবতীয় মশকরা শুধু ক্ষ্যাপাদিগের মধ্যে দেখা যায়। ফলে, সোনা বা গৌর হৃদয়ে থাকে না শুধু থাকার ভান হলে বোঝা যায় দূরে কোথাও আসর বসেছে রাতভর গান হচ্ছে সুফিয়ানা কালামে ভরে যাচ্ছে কারো কারো মগজের লাল ম্যাগাজিনগুলি।

2: মার্চ 2007

আমাদের হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীতে যে ষাঁড় ঢোকে চিনেমাটির বাসন সামলে সেও চুপ, নতশিং, শুধু হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীর বক্ষে ঢেউকুড়কুড় লোনা আঁশের আঁটি চেটে ফেলেছে ব’লে তার রং বদলায় সবুজ বা নীল কখনো সাদাও। অথচ হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীতে সেদিন গঞ্জের ছেলে বুড়ো মাগী মদ্দা সকলেই স্নান করে ও আঁচায়, নিজের লিনেন কাচে মেঠো সাবানে, কেউ ভুলে কুলকুচি করে ফ্যালে। তাই আমাদের হুলাহুপ, কথাবার্তা নদীতে আজ যে নীল-সাদা ষাঁড় ঢোকে, চিনেমাটির বাসন সামলে সেও চুপ, নতশিং, শুধু অভ্যাসে জাবর কাটে ল্যাজে ও গোবরে। সে জাবরের ঘসঘসে শব্দ নদী ও হুলাহুপে ক্রমে কথাবার্তারূপে প্রতীয়মান হলে চীনেমাটিতে চিড় ধরে আর ও গ্রামে কাঁঠাল পাকলে তার গন্ধ নদী ও হুলাহুপ কথাবার্তা পেরিয়ে ছড়িয়ে যায় এ গ্রামে ও সে গ্রামে।

3: মার্চ 2007

সে এক ম্যাওপাখির কথা যার ডানায় ঘুড়ির সুতো লেগে যায় বলে অমন মিশমিশে কড়িটানা পেটকাটিটা ফেঁসে যায় সুতোও হারিয়ে যায় বেশ কিছু ভালো মাঞ্জা আর বাবুসোনার তাই বড় মনখারাপ হয় আর সে নায় না আর খায় না শুধু দাপটি করে উঠোনদুপুরে সেজগিনি্ন চুলের ঝুঁটি নেড়ে দিতে বাবুসোনার চিল চিৎকারে মটকা গরম হয় বড়বাবুর এমনিতেই পিত্তির ধাত তার উপর এই হারামীর বাচ্চা ভর দুপুরে মড়া কান্না জুড়লো কেনো বলতেই সেজ বাবু বলে উঠলো হারামী তোর বাপ যা শুনে উদুম বাওয়ালী লেগে গ্যালো আর হাতাহাতি আর লাঠালাঠি আর কাটাকাটি হতে হতে কোর্ট কাছারী পুলিশ আদালত কাজী পেয়াদা বাসনওলা তালমিছরী প্রস্তুতকারক বনেদী বেশ্যা আরামবাগের মুরগী সব ঝটপট ঝটপট ঝটপট করতে লাগলো আর সেই গোলমালে ম্যাওপাখির ডানা গলায় মাঞ্জাসুতোর ধার কেটে বসলে কেমন রক্ত বেরিয়ে লাল জমে কালচে হয়ে গ্যালো মাছিতে তা আর কেউ নজরই করলো না ।

4: এপ্রিল 2007

বাঁকানো হরফ ও চেনা কালিতে সাতসকালের রোদগুলি যখন জানলা গলে উড়ে আসে তোর হাতের লেখা হয়ে, তখন এ স্ক্রীনচেয়ারের বোতল-বালতি, এঘর-ওঘর জুড়ে বড় এলোমেলো হয় আর ছিটকিনির শব্দে ঘুম ভাঙলে তোর স্নানের দরজার কথা মনে হয় - সাদা ও বন্ধ ফলে ভাবলেশহীন।

5: এপ্রিল 2007

ঘরবাদলায় পেখম ঝলসে ওঠে। ল্যাজ ও নুটিতে বাঁধা হয় মন্ত্রশাস্ত্র, ধ্বনি। হুলুধ্বনি ও ভুরিভোজের আদলে গড়ে তোলা হয় লাইব্রেরী, শয়নকক্ষ ও গোটানো মাদুরের মতো টুকটাক কথাবার্তা; ছবি ও সই মেলানো লেবেল।

6: মে 2007

জোড়া বালিশ ও রক্তাক্ত চাদরের গল্পে আমাদের তাক্‌ লাগে, তুক্‌ হয়, বাণ মারামারি আর চালপড়া বাটিচালা চলে, শনিবারে ভর হয়। ভুডুর পুতুল থেকে উঠে বসে রণক্ষেত্র; পিতামহ শরশয্যায় এমত ক্যালেন্ডারের ছবিতে ভীষ্ম জল খান ও আমাদের দেওয়ালনির্বাচনের ইতিহাস লেখার বকলমে ভরে যায় বালবাগিচার খোশ গপ্‌সপ্‌।

আমাদের ছোটো ছোটো খাতায় তখন হাতের লেখার চাষ হয়; দেখে মনে হয় লগবুক রাখা হচ্ছে সেয়ানা শিবিরে।

7: মে 2007

আগের লেখার শনিবারের আগে ‘ফি’ শব্দটি বসানোর জন্য এ শনিবার লগিন বাগান ঘুমিয়ে পড়তেই ভূগোল খাতার পেছনের পাতায় শুরু হয় কাটাকুটি খেলার ভেজা ন্যাকড়াগুলির লাল রং আর বারিস হ’তে পারে বলে বিদায় নেবার কালে শেখসাহেবের খুদা হাফিজে বিন্দু বিন্দু কান্না দেখা দেয় সেই দুপুরবেলা থেকেই। অথচ ‘ফি’ শব্দটির মানে মনে আছে ছোটোবেলায় টিফিন বাক্স ছিলো, টিউশনি ও ডাক্তার; কোনোকালে ‘ফি’ মানে চোখে চুমু ছিলো। শনিবারও ফি ছিলো। তখন।

গুরু তোমায় … (সটীক সংস্করণ)

Wednesday, August 8th, 2007

ছোটোবেলা থেকে দেখে আসছি, প্রতি বছর, এই চোত-বোশেখ মাস এলে, দুনিয়ার লিটল ম্যাগাজিন, কালচার শপ ও আন্ডাবাচ্চাদের মধ্যে ভারি ঢলো-ঢলো ভাব হয়। আমি এদের কোনোটিই নই। তাই, বোশেখ মাসের পঁচিশ তারিখ কত্তাবাবুর আবির্ভাব হেতু আহ্লাদ করতে করতে নেজ নাড়ি নি কোনোদিনই। তবে বয়সকালে, খোঁপায় ফুলআঁটা তাঁতের শাড়ি দেখতে দু’একবার খোদ এলাকায় যে ভোরবেলায় ঢুঁ মারি নি, একথা হলপ ক’র বলতে পারবো না। কিন্তু সে আমলে, আমার থোবর থেকে হাওয়াই চটির সেপটিপিনে পজ্জন্ত এমন ছ্যাবলা ছ্যাঁচরামীর ছাপ লেগে থাকতো যে ফুলেল তাঁতের শাড়ী তো দুর অস্ত, এক পিস চৈত্র সেলের ছাপা শাড়ীও তখন আমার জোটে নি। কিছুটা সেই রাগেই, আর কিছুটা বিপ্লবের খাতিরে, আমি ক্লাস এইটের পরে আর কত্তাবাবার জন্মতিথি নিয়ে কোনো লেখালিখি বা কেত-কায়দা মারি নি। অবিশ্যি একবার একটা লেখায় বাঙালী বণিকের জাহাজ, পুরণো বাড়ি আর নমস্কার করার কথা ছিলো ব’লে, একটি পত্রিকা সেটিকে তাদের পঁচিশে বৈশাখ ইস্যুতে ছেপে দেয়। এ ঘটনায় আমার কোনো হাত ছিলো না। এর অনেক পরে, এই 2007 সালের পঁচিশে বৈশাখ দিবসে, তাঁতি সর্বপ্রথম ভেবে চিন্তে একটি এঁড়ে গোরু নিয়ে আসে। এঁড়ে গোরুটির হাতে হ্যান্ডহেল্ড, মুখে স্মাইলি ও তার চেহারাটি নিম্নরূপ:

গুরু, তোমায় ..

গুরু, তোমার জন্মদিনে পিঁক পিঁক এসেমেস পেলে মজা পাই আর পিন্ডদানের পাথরে বিষ্ঠার কারুকার্য দেখে মনে পড়ে আমাদের হাফপাত্‌লুন সকালগুলির মিহি ও অস্পষ্ট ধুয়ো ধরার কথা। মনে পড়ে গান ও গুঁতো গিলে খাওয়ার কোঁত্‌ কোঁত্‌ শব্দে সারা পাড়া কেমন মাথায় উঠতো রোজ ভোর ও বিকেলে। টুকে লেখা চিঠিও মনে পড়ে, মনে পড়ে কানহীন মানুষের ছবিতে ক্যামন ভরে যেত আমাদের দখিনো দুয়ার, জীবনো যৌবনো, ভরা বসন্তেরো কাল।*

ভালো থেকো গুরু, আলমারী ও ব’য়ের তাকে, দেয়ালে, আমাদের মাথার ভেতর।


*পরবর্তীকালে, “মনে পড়ে গান ও গুঁতো গিলে খাওয়ার কোঁত্‌ কোঁত্‌ শব্দে সারা পাড়া কেমন মাথায় উঠতো রোজ ভোর ও বিকেলে। টুকে লেখা চিঠিও মনে পড়ে, মনে পড়ে কানহীন মানুষের ছবিতে ক্যামন ভরে যেত আমাদের দখিনো দুয়ার, জীবনো যৌবনো, ভরা বসন্তেরো কাল।” - এই লাইনগুলি আমার ভারী প্রিয় হয়ে ওঠে।

জার্নাল 02

Wednesday, August 8th, 2007

বেশ কয়েকমাস লেখালিখির চৌহদ্দি থেকে বেপাত্তা। মনোযোগের অভাবের নামে দোষটা চাপিয়ে দিয়ে নিপাট দাঁত কেলাচ্ছি। জীবনের সঙ্গে তো ঝামেলা সেই হিন্দু হোস্টেল থেকে। জীবনের ভাগে তখন পাঁচ নং ওয়ার্ডের ক্যান্টিন আর আমি তখন অমিতাভর ভাগে, ঐ পাঁচ নম্বরেই। জীবনের এই পর্যায়েই জীবন প্রত্যক্ষ ভাবে আমার সামনে আসে এবং তার কালো তৈলাক্ত ভুঁড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে 84 টা পান্তুয়ার দাম চায়। জীবন এর আগে, এবং এর পরেও, আমার কাছে এরূপ বেয়াক্কেলে আবদার খুব করেছে। ফলে, আমি হুঁ হুঁ তানানানা ইত্যাদি ক’রে যেতে থাকি। জীবন স্বাভাবিকভাবেই আমার উপর উদুম খেঁড়ে যায়। অথচ, এই আমি কী-বোর্ড ছুঁয়ে মা শেতলার কিরে কেটে বলতে পারি, জীবন বেটা ডাহা ঢপবাজ, 84 টা পান্তুয়া এক সঙ্গে শুধু আমি আমার জীবনে না, জীবনও তার গোটা জীবনে মনে হয় একসঙ্গে খেয়ে দেখে নি। জীবনের এই বেমালুম বেহায়াপনায় আমার হাড় জ্বলে গেলেও, পরে ‘ধূসর জীবনানন্দ’ পড়ে বুঝতে পারি, স্থান-কাল-পাত্রের ভেদ থাকলেও আসলে সকল জীবনের প্রকৃত স্বরূপই এইমত এক। অতএব জীবনের পান্তুয়ার হিসেব বুঝতে বুঝতে ঈষৎ ক্লান্ত হ’য়ে হেদিয়ে শেষ-মেষ আবার যখন কলম ঝাড়লুম, তখন দেখি কোথায় পান্তুয়া, বরং তেজারতির খাতায় খামোখা তেজপাতার আড়ৎ। এই বাজারে অনেক হেগে-পেদে যা-ও দু’একটি লেখা লিখলুম, তা-ও কেমন মিয়ানো মিয়াও মিয়াও শোনালো। লেখা বলতে ধকে কুলোলো না। বললাম, খসড়া। বাওয়ালীর নতুন ধুয়ো।

আসলে নিষ্পৃহতা এক প্রকার বিলাতি জামা, নীল বা চারকোল রঙের দেওয়ালে যা ঝোলানো থাকে। কোমরের কাছে লেগে থাকে লাল কাপড়ে মোড়া সাদা সুতোর একটি নাম। তাতেই সর্বস্ব বাঁধা থাকে।

ডকুমেন্টেশন

Tuesday, April 3rd, 2007

ডকুমেন্টেশন
[2005]

1. ভূমিকা:

ডকুমেন্টেশন বলতেই পায়ে বুটজুতো ও বুটিদার কালো মোজা থেকে সোজা নেমে আপিস চত্বর । যার বাসডিপো ডানদিকে নেভী ব্লু ইউনিফর্মে বাঁধানো দরজা হয়ে গেলে সারা সকাল ধরে সমগ্র দোতলা জুড়ে ছড়িয়ে থাকা এইসব শব্দাবলী থেকে খুঁটে খুঁটে ম্যান আওয়ার টুকে রাখে ম্যানেজার । বাংলা হয় না বলে তাদের শরীরে ঢাকা থাকে চৌখুপী কাঁচের মতো দু’চারটি .DOC ফাইল আর হাইলাইটে কাঁচা হলুদের রেফারেন্স দিতেই বুলেট পয়েন্টে লেখা হয় :

1.1 দক্ষিণী মহিলা
1.2 রাজুদা’র গায়ে হলুদ
1.3 যেবার জন্ডিস হলো পর পর দুইবার …..

2. প্রয়োগবিধি:

টেবিল ও টানা জানলার পাশে জমে উঠতেই ছোটোখাতা নোটপ্যাড* ক্রমশঃ বাসগুমটির মতো এক একটি সকাল হয়ে যায় ঈষৎ চুপচাপ কোনো রেসকিউ হোমের কিশোরী* আর মেয়ে কন্ডাক্টরের ডিউটি শেষ হলে তার খাকী ইউনিফর্ম নীচে গেট মুখে দাঁড়িয়ে থাকে যেন একটি কথা বলা মোটর বাইক কিছুক্ষণ পর হু-শ করে চলে যাবে পার্কে ও পাথরের কেয়ারিতে । কিছু পরে মাইসোর মাল্লিগে* ও সেদ্ধ বাদামের বিবরণ কিছুটা বিস্তৃত হয়ে উঠলে মিহি মনোযোগ ক্লোজ-আপগুলি ভরে যায় ছোটো ছোটো নির্দেশিকা ও তালিকা লেবেলে আর সেখানে কালোঢাকা কাঁচের গায়ে সরু সরু গান বাজতে থাকে ঢিক-চিকি-ঢিক-চিকি* জেন ও জানালায় ।

3. পরিশিষ্ট:

3.1 *ছোটোখাতা নোটপ্যাড: ছোটো খাতা নোটপ্যাড উভয়তঃ সুবিধাজনক ও সুলভ , তাই আপনার খুঁটিনাটি স-ব কিছু নথিবদ্ধ দেখবেন চমৎকার পেশাদারী কেতা ও কায়দায় দুরুস্ত রাখা আছে পর পর ভারী শান্ত ও শায়িত , এররহীন আর আপনিও মিলিয়ে নিতে পারছেন নম্বরের আকৃতি বিশিষ্ট এক একটি নরম সেভিং ফোম মিটিং , সহজেই আপনার টাস্কবার দেখে ।

3.2 *রেসকিউ হোমের কিশোরী: এসব কিশোরীরা নতমুখী ও আশ্চর্য ক্যামেরাব্যাপী যে স্বর্ণকেশী ছবির দোকানে চৌকো ফ্রেমের মতো হলুদ হাইলাইট হয়ে যায় বার বার , ন্যাশনাল জিওগ্রাফিক দেখে না বলে তারা তাকে চিনতে পারে না । ফলতঃ এবম্বিধ কারুকার্যে এমনকি চুলের রং ও পরিবার বদলে গেলেও ধরা যায় না রংপেন্সিলের বাক্সে কিভাবে বসে থাকে কুঁড়ে ঘর ও আদিবাসী তরুণ আর এ পর্যায়ে লেন্সের দিকে তাকালে দেখা যায় বাঁধানো মেঝের মতো সেন্টারহোম জুড়ে রেসকিউ হচ্ছে কতগুলি পাখী , হাতে ফল , ছোটো ক’রে কাটা , রঙীন প্লাস্টিক , কিছু জলের বোতল ।

3.3 *মাইসোর মাল্লিগে: মাল্লিগে মানে লাল সাদা মল্লিকা ফুল যারা সকালে ও বিকালে দু’বেলাই নিয়মিত খুচরো খিদেগুলিকে রোগা হাতে গেঁথে রাখে থোকা থোকা বিনুনীতে । কারণ তারা জানে প্রতিদিনই এসময়ে বিবিধ নগরপালিয়া থেকে বেড়িয়ে আসে হিজ রয়্যাল ম্যাজেস্টি অব মাইসোরের সারিবদ্ধ পাগড়িগুলি আর তাদের পিছনে লম্বা দুলতে থাকে নারকেল তেলমাখা সিঁদুরের টিপফুল লাল সাদা - থোকা থোকা খিদে ।

3.4 *ঢিক-চিকি গান: ঢিক-চিকি ঢিক-চিকি শব্দগুলি টানা ও প্রলম্বিত হ’লে সন্ধ্যেবেলায় রাস্তা ও জোরালো ল্যাম্পপোস্ট জুড়ে ঘুরে বেড়াতে থাকে ছোটো বড়ো সীটবেলট যাদের কাঁচকালো জানালায় অনর্গল ফিতের মতো ঝুলতে থাকে যেন গান বা এরকম ফেরোমেন শব্দ ট্যাগ যার এককোনে লেখা থাকে নাম , তার পিতার মেডেল । ফলতঃ এইসব ঢিক-চিকি শব্দঋতু দিনান্তে চমৎকার এক ঝাঁক পলিথিন পাখি হয়ে উড়ে বেড়ায় রাবারে ও রাস্তায় যেহেতু আরো পাখি পলিথিন , শব্দগুলিকে আলগা শুনলে মনে হয় প্রকৃতই এক আশ্চর্য গান হচ্ছে ঢিক-চিকি ঢিক-চিকি ঢিক-চিকি ।

4. তথ্য ও যোগাযোগ: আর এখানে কোনা করে সইকোটেশনে লেখা থাকে ডাকঘর , তার বার্তায় সকলের নাম ও পদবী পরিচয় ।

জনার্দনের প্ল্যান্টেড ট্যাঙ্ক

Friday, March 23rd, 2007

জনার্দনের প্ল্যান্টেড ট্যাঙ্ক
[2003]

[Freshwater Planted Aquarium; 48″x18″x18″; 3 Watt/Gallon; pH 7-7.5; 26-28 Degree Centigrade; Substrate: Laterite and Gravel; Fertilization: KNO3+K2SO3+MgSO3+Micro Nutrients]

[জীবিত প্রত্যক্ষদর্শী প্রতিনিধিকে জানান যে সারা রাত দনাদ্দন ট্যাঙ্কের শব্দে দু’চোখের পাতা এক করতে পারে নি এলাকার মানুষ আর এখন খবরে আরো প্রকাশ পেতে থাকে সমগ্র এলাকা কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ায় গোলাবর্ষণ ও ট্যাঙ্কের এই মর্মান্তিক দনাদ্দন দনাদ্দন আওয়াজ কাঁচ ও জল পেরিয়ে এদিকে এলে অংশত মোলায়েম হয়ে পরে]

… আর আমার নাম জনার্দন হয়ে যেতেই জনার্দন জলগাছাদের গায়ে নরম নরম বুলিয়ে দিতে থাকে তার সরু আঙুলের ছাপ এবং জনার্দনের নখের কোনে, কাঁচে ও পুরনো বাটিতে জমে থাকতে থাকা বিবিধ লবণের রঙ বিবিধ হলেও দেখা যায় সকলেই এক - একমাত্র সাদা। অতএব এরপর থেকেই জনার্দনের চোখের নীচে পড়ে থাকে জল আর জলের মতো সবুজ ও গুটিয়ে রাখা রেখাপত্তর, আঁটি। আর জনার্দন নিজে নিজেই প্রতিদিন বোতলে বোতলে গুনেগেঁথে গুছিয়ে তুলতে থাকে গাভীন শামুকের মতো জনার্দনের দৈনন্দিন শাকগুটি ও তার এলোমেলো ছিপির অংক, বুদবুদ। আর ওয়াও!! উইদিন আ উইক অর সো, জনার্দন জনার্দনের আঙুলের ফাঁকে, শিকড় থেকে বের করে একে একে জনার্দনকে, জনার্দনের রেখাপত্রে, বালিতে ও পুরনো কাঠেও।*


*আমার অ্যাকোয়ারিয়ামগুলি ও তাদের বাসিন্দা জলগাছারা আমাকে এতটাই প্রভাবিত করে যে, 2003 সালের মাঝামাঝি এক দুর্বল মুহূর্তে, আমি পূর্বজন্মের কোনো সাংস্কৃতিক পাপবশতঃ অ্যাকো্যারিয়াম নিয়ে একটি গদ্যে লেখা মহাকাব্য লিখতে উদ্যত হই। লেখাটি শেষ না হলেও শুরু হয়। আর এই অব্দি লেখার পরেই ইরাকে যুদ্ধু লাগে, আমার বিবেক জেগে ওঠে ও আমি খান্তি দেই।

এ প্রসঙ্গে আমার আ্যাকোয়ারিয়ামের কিছু ছবি দেখানো যায়। হয়তো উপরের লেখাটির সঙ্গে আ্যাকোয়ারিয়ামের কিছু ছবি দেখলে ছবিগুলি বোঝা সহজ হতে পারে।

Creative Aquascapes and Nature Aquariums by Samit Roy
From Nature Tanks
Creative Aquascapes and Nature Aquariums by Samit Roy
From Taboo Island
Creative Aquascapes and Nature Aquariums by Samit Roy
From Secret Shore

আমার অ্যাকোয়ারিয়াম আর জলবাগিচার আরো ছবি »
আমার অ্যাকোয়ারিয়াম ব্লগ »

আগে যখন কবিতা লিখতাম

Wednesday, March 14th, 2007

শেষদৃশ্য
[2000]

এখনি ঈষৎ রাত। মৃদু ধুলো;
সাজানো ত্বকের মতো, স্ক্রীন ঢাকা ছায়া -
ক্রমশঃ ছড়িয়ে যাবে;
নিভু চোখ, জুড়ে থাকা সীমান্তের মাঠে
দেখা দেবে ধু ধু একা বোধ -

ঠান্ডা রোদের মতো সময়ের স্রোত
ফিরে যাবে -
ঘুমে;
একাকী ধোঁয়ার ফিতে
শুধু জাগবে অন্ধকার গ্রহে।

ভোর
[2000]

অনেক রাত্রি এলে
আকাশের কাছে ক্রমে নতজানু চোখ -
ঘুমে ভেজা
কুয়াশা ছুঁয়েছে ধীরে কপালের কাছে
দ্যাখো এক ঘন দাগে থমকেছে চাঁদ
একা
ও অনেক তারা - তারাদের মাঝে
ক্লান্ত; মাটির ঘ্রাণে নেমে গ্যাছে নীচে -

বহুদূরে
তখন আজান শুরু; হাঁটু মুড়ে
তোমাকে সামনে রেখে -
অবাক আলোর রেখা
দিগন্ত পেরিয়ে গ্যাছে;
বলে গ্যাছে -
‘দেখা হবে আধ ঘন্টা বাদে,
সূর্যোদয় - লেখা আছে পাঁচটা চল্লিশে ….’

আত্মসমর্পণ
[2001]

বস্তুতঃ জড়িয়ে আছি ও আমার শিকড় ক্রমে
গাঢ় হচ্ছে,
নেমে যাচ্ছে এই সব চৌকো পাথরে
একা ও সেই সঙ্গে অসম্ভব নীল
কোনো স্রোত ছুঁয়ে যাচ্ছে
শেষ সীমা, প্রান্তবর্তী মাঠ -

নিরীহ গমের ক্ষেত থেকে
তখনো উড়ে যাচ্ছে ছোটো ছোটো রেখা।

আমাদের বাথরুমগুলি

Saturday, March 10th, 2007

আমাদের বাথরুমগুলি
[2005]

আমাদের বাথরুমগুলি : বাথরুম 1

শৈশবেই বাথরুমের দেওয়ালে লেগে যায় ম্যাজিক। ফলতঃ তখন থেকেই এবম্বিধ ঘর বড় প্রিয় ও মনোরম ছবিতে ছবিতে বদলে যায় মুহূর্তেই যেন অন্য কিছু, অন্য আদল নিয়ে লেগে থাকে মর্ফিং দেওয়ালের আবছা ঘুলঘুলি আলোয়। বাসি জলের ঠান্ডা রেখা ও চিত্রসমূহ, কোনার্ত মাকড়সাদের লম্বা লম্বা পাগুলিকে নিয়ে যায় জঙ্গলভরা কমিক্সের সবুজ বাক্সে আর সন্ধ্যেবেলায় নিয়মিত মোমবাতিদের হাফপ্যান্ট গোলাটে অন্ধকারে এঁটে বসলে, এলোমেলো ক্যালেন্ডারের মতো দেওয়ালে কেঁপে ওঠে ছবিসহ বাথরুমের ড্যাম্প। তারপর বাথরুম বদলিয়ে যায় ……

আমাদের বাথরুমগুলি : বাথরুম 2

ঘন্টা পড়লেই নটিবয় শু-য়ের সঙ্গে ছুটে আসে সাদা মোজা পরা টিফিন বাক্স আর বারবারান্দায়, কাঠের রেলিং ঘেরা ঘোরানো সিঁড়ির মতো লাইন পড়ে গেলে, ছোটো বাথরুমের ভেজানো দরজার সামনে দাঁড়িয়ে শুধু এ’পা-ও’পা করে দেওয়ালের ছটফটে ঘাম আর ফুলপ্যান্ট, চোখ মারামারি। অথচ অন্য সময়, চকখড়ি ও পুরনো পাখার কি-শ কি-শ শব্দে ব্ল্যাকবোর্ড, স্কুলবাড়ি ভরে গেলে দরজার পিছনে চুপচাপ নেমে আসে ডটপেনসিলে লেখা বাথরুমের নাম ও কারুকাজ; কার যেন পরীক্ষার খাতা। তারপর বাথরুম বদলিয়ে যায় ……

আমাদের বাথরুমগুলি : বাথরুম 3

হলট স্টেশনের গাছ ও উঠতি মফঃস্বলে, ঝুলন্ত তারজালি ঠাসা বয়েল ডিমের মতো বিকেল নেমে আসতেই, হেডমিস্তিরী ঘরমুখো হাত ও কর্নিকে দ্রুত, ইঁট-চুন-ঘেঁষে গেঁথে ফ্যালে পৈতৃক স্বপ্ন ও বাথরুম। কর্নারপ্লট ঘিরে দেওয়া হয় বাখারির বেড়া আর সুপুরি ও ক্যাকটাসের পর্যাপ্ত আলো-বাতাসে প্রতি সকালেই বাথরুমের চুনকামে লেখা হয় সংবাদপত্রের হাওয়া ও ফড় ফড় শব্দ। ফলে টিফিনের ব্যাগগুলি রোববার হলে রঙমিস্ত্রীর এনামেল সবুজ হাত মুছে ফ্যালে পুরনো লুঙ্গির খোপকাটা ছবিতে আর প্রতিবেশীর নাম লেখা আলো পড়লে বাথরুমের দেওয়ালে দুলে ওঠে নিষেধাজ্ঞা, পরিচিত সাবানের দাগ। তারপর বাথরুম বদলিয়ে যায় ……

আমাদের বাথরুমগুলি : বাথরুম 4

- এর মানেই হলো ছুটন্ত মেঝে ভর্তি জল অথবা যেকোনো কিছু যা কিনা জলের মতো ছড়িয়ে যায় ভিজিয়ে দেয় আমাদের বেলবটম টানাছুটি স্টেশনগুলিতে, কখনো সখনো ঘুমচোখ রাতে। তারপর শীত করলে আমাদিগের গোড়ালিময় দেখা যায় একপ্রকার শির শির গন্ধ। ফলতঃ এইসব অপছন্দময়তায় কোম্পানী জুড়ে যে সমস্ত রেখাচিত্র চুপ চাপ জেগে ওঠে, আলো হলে খেয়াল হয় তাদের সকলের ডটপেন বই ও আমসত্ত্ব, হলদে সেলোফেনে মুড়ে ফিরি হয়েছে সেই কবে থেকে স্টেশন জানালায়। এ কথা জানার পরেই গতিবুঁদ - ঠিক কোণে তাকাতে পারলে চোখে পড়ে কাশফুল, নীচে বৃত্তাকার বালি অথবা জল কখনো বা স্লিপার পাথর। আর থেমে গেলে ভয় করে বার বার নোটিশফলকের পাশে লেখা হয় আঁকাবাঁকা ডটপেন, চাপা কাম, শীলা সাহু (খানকি) ফোন নং 2467893। তারপর বাথরুম বদলিয়ে যায় ……

আমাদের বাথরুমগুলি : বাথরুম 5

প্রতিবিম্ব উজ্জলতর হলে দেখা যায় অজস্র কাঁচছবি ঝুলছে বিদ্যুৎবারান্দা পেরিয়ে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকা বিবি ও সাহেবের ছবিছাপ নম্র গোলামে আর সমবেত বাথরুমগণের লিঙ্গনির্ধারণ হয়ে গ্যাছে আরো আগে বাথরুমবারান্দা ও দরজা দেওয়াল জুড়ে ক’বছরে ভরে গ্যাছে লেবেল নির্দেশ। তাই সন্ধ্যার ঝোঁকে বাথরুম-বাথরুমীদের চাপা আলাপে রোজ ভরে ওঠে মহল্লা বার, কফিশপ, পুল আর মাঝরাতে হ্যান্ডসাম ছেলেবাথরুদের মাপা হিসি থেকে প্রকৃতই সুগন্ধ ভেসে এলে মেয়েবাথরুমগুলির গোপন ব্যস্ততায় ভরে যায় আলোকরিডোর; গোলামদানীতে মেপে রাখা ছাঁচগোলাপের কারিকুরি। অথচ এখনো রাঙা টাই বাথরুমরীতি ‘এক্সকিউজ মী’ বলে উঠে দাঁড়ালে এখানে কার্পেট লাইন পড়ে যায় টানাবাথরুম লাগোয়া খিলানে। জুতোর ময়লা লেগে বারংবার কাঁচসিলিং নোংরা হয়ে গেলে, মানুষের আয়নাফেরৎ পাপোষগুলি চমৎকার মুছে রাখে যাবতীয় টিস্যুলিপি, দাগ ও পালিশ। তারপর বাথরুম বদলিয়ে যায় ……

প্রেমিকাকে লেখা শেষ চিঠি

Thursday, March 8th, 2007

প্রেমিকাকে লেখা শেষ চিঠি
[2003]

এখন সাদা দুপুরের দিকে তাকিয়ে দ্যাখো তুমি জানলার ফাঁক গলে সে-ও চলে আসতে চাইছে তোমার ঘরের ভিতরে আবছায়া অন্ধকারে জেগে থাকছে ফ্যানের শব্দে মিশে থাকা সিগারেটের ধোঁয়া ধীরে ধীরে ঘন হয়ে পাক খেয়ে উঠে যাচ্ছে সিলিং-এর কাছে জমা ধুলো ও মাকড়সার জাল জুড়ে থেমে থাকছে বিয়ের রাতের লুচি-মাংসের স্মৃতি নিয়ে হাহাকার করতে গিয়েও থমকে যাচ্ছে তোমার মাথা তখন কিছুই বুঝছে না বলা নিতান্তই ভুল ভেবে ধরে নিচ্ছো সব সূত্র বোঝা গ্যাছে জট খুলে আপাততঃ প্রাঞ্জল হয়েছে ভেবে যে মুহূর্তে তর্জনী তুলে ধরছো নরম মগজে তুমি শুনতেও পাচ্ছো না ফিস্‌ ফিস্‌ শব্দ করে দু’একজন ঠোঁট চাটছে তোমার মাংস খাবে বলে তারা আজ ভারী তৃপ্ত হয়েছে তোমাকে লুকিয়ে তারা রং মাখছে মুখে অন্য উচ্চারণ নিয়ে তারা জিভ জুড়ে রেখে দিচ্ছে রক্ত ও মাংসের লোভ তোমার চোখেও পড়ছে না এইসব ছেনালীপনা ক্রমশঃ গ্রাস করছে তোমাকে সঙ্গে নিয়ে যাবে বলে ডেকে নিচ্ছে পরিচিত স্বরে তুমি সব কিছু ভুলে গিয়ে হেঁটে যাচ্ছো পায়ে পায়ে তোমার বিস্তীর্ণ গোলাপ ফুল কাঁটা হচ্ছে ভয়ে সিঁটিয়ে যাচ্ছে নড়বড়ে সাঁকো নাড়াতে পাগলকে বারণ করেছো বলে আজ দিগন্তে কেউ নেই দেখে একা হচ্ছো নিজে নিজেই ভেবে যাচ্ছো একা নও এইসব দুপুরবেলায় বন্ধু ভেবে হাত রাখছো নতুন চাদরে কোনো পুরাতন দাগ দেখে যখনই ভাবছো এ সময় চেনা নয় অন্য কোনো পৃথিবীর টান তোমার মেরুদন্ডে ঢুকে গেলে চম্‌কে উঠছো তুমি আশে পাশে ঢেলে রাখা মাংসের স্রোত দেখে চিনে নিচ্ছো নিজের ছবিতে দেখা রক্তের দাগ রঙের প্রলেপ ভেবে খুশী হচ্ছো ভোরবেলা ত্বকের যত্ন নিয়েছিলে বলে অংশত বধির তুমি শুনতেও পাচ্ছো না ক্রমে জিভের শব্দে ডুবে যাচ্ছো এই মাংসল বিকেলে তোমার একাকীত্ব ধীরে ধীরে ঘন হয়ে পেরিয়ে যাচ্ছে শেষ সীমা ছাড়িয়ে অনেক দূরে তুমি বুঝতে চাইছো এই লাল রং লোভের গন্ডী মেনে ঢোঁক গিলবে তোমার শরীরে তখন মৃদু শব্দ মুছে নেবে দুপুরের সাদা রঙে বিকেল গুটিয়ে এলে দুপাশে পালক রেখে মৌনতা ছুঁয়ে থাকবে ধবল বালিশে একা দাগ লাগলে ভেবে নেবে রাত হচ্ছে গোপনে বদলে যাচ্ছে লোভ তার অন্য কোনও আলোয় আকাশ চিনছে মেঘলা শিকারীর মতো তুমিও খুঁজে নেবে আঘাতের উন্মুক্ত স্থান থেকে শুধুই পুরনো দাগে ক্ষতচিহ্ন রয়ে যাবে রক্তের স্বাদে তারা তোমাকে বদলে দেবে সন্ধ্যা হলে কপালে আলোর রেখা সীমানা পেরিয়ে এসে তোমারই সামনে বসে খুঁজে নেবে শেষচিহ্ন তোমাকে প্রশ্ন করে শান দেবে জিভে …

শ্যাওলা ও অন্ধকার বিষয়ক কিছু কথা

Thursday, March 8th, 2007

শ্যাওলা ও অন্ধকার বিষয়ক কিছু কথা
[1991]

এসব আপাতব্যস্ততা আর দু’একটি কিশোরীর শরীরসন্ধান,
অহরাত্র ধরে তাদের মা ও মাসীকে আমি ভীষণ চিনে যাই;
আর আমারও সর্বশরীরে কখনও রাত্রি নামে বিষণ্ন মেঘময় -
কেননা এ হস্তকাম ছাড়া এযুগে সকল নিষ্কাশন নিষিদ্ধ।
কাহাদের ঘাম বীর্য মাটি ও মদ্য সমাপ্ত হয়ে সন্ধ্যা নেমেছে
তোমার যত ভ্রূণে ও ভ্রূণমূলে; যেখানে সন্তান হবে না শুধু
রৌদ্র আছ্‌ড়িয়ে পড়ে আমার ভূত ও ভবিষ্যৎ সমানে নষ্ট হয়।
তোমার এখানে ও সেখানে মুখ ঝুঁকিয়ে চুবিয়ে আমি দারুণ
নেশাগ্রস্ত আর তখনই আমার জন্মগুলি ভীষণ একাকী ।

আমি ও অনন্তনাগ একই রক্তে মিশছি আস্তে আস্তে শব্দ করিনি,
কারণ এখনও আমার এ রাত্রিপথ হাঁটা শুধু অন্ধকারময়।


এই লেখাটি আমার প্রথম জীবনের লেখাগুলির মধ্যে সম্ভবতঃ একমাত্র আস্ত লেখা যা আজও আমি তক্তাপোষের তলায় জমিয়ে রেখেছি।

লেখাটি নিয়ে একটি হালকা, প্রায় গোলাপী কটন ক্যান্ডির মতো কিচাইন হয় 2006 সালে সামহোয়ারইন ব্লগ ডট নেটে এই পাতায়। যে দুই মানুষের সঙ্গে এই কটন ক্যান্ডির গোলাপী বাওয়াল খেতে খেতে আলাপ হয় তারা হলেন কৌশিক আহমেদহিমু। পরবর্তীকালে এরা দুজনেই আমার বন্ধু হয়ে ওঠেন ও আমার লেখা পড়ার মতো দুরূহ কম্মোটি ভদ্রতাবশে প্রায়শঃই করতে থাকেন।