Archive for the ‘দৃশ্য শিল্প’ Category

বুনো মরিচের জঙ্গল ও একটি প্রচ্ছদকাহিনী

Sunday, October 7th, 2007

Digital Art by Samit Roy

“…তোমাকে দেখাতে পারতুম বুনো মরিচের জঙ্গলে ঠ্যাঙ্গাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে…” - কমল চক্রবর্তী

বাবু কমল চক্রবর্তীকে দেখতুম দূর থেকে কখনো খুব কাছে আড়চোখে, কৌরব স্টলের বইমেলায়। সাহস ছিলো না, তাই আলাপও। আমাদের তখন হাতেখড়ি হয়ে গেছে পেন জুড়ে নেমে আসছে কিশোর বিদ্যুতের রেখার মতো নরম গোঁফের রোম। আর রোয়াবে পিঠের কাঁটা খাড়া। আমরা তখন লিখতে শিখছি ও কথা বলতেও। আমাদের কলমের শব জমছে দিগন্ত জুড়ে ধু ধু পুড়ে যাচ্ছে তখন আমাদের না-লেখা পান্ডুলিপি, খাতা।

তারপর, অনেক শেখা, অনেক ঋণ। আর, তারও অনেক পরে, আমাকে গদ্য লেখার সাহস ও শিক্ষা যোগান তিনিই। তবে, সেকথা তিনি জানতেন না।

কমল চক্রবর্তীর লেখা নিয়ে আমার প্রথম সচেতন নির্মাণ উপরের ছবিটি। নেহাতই সরলীকৃত চিত্রণ, আক্ষরিকও। বুনো মরিচের ঘন সবুজ লতার জঙ্গল প্রথম দেখি কুর্গে এবং তা মনে থেকে যায়। তাই, বুনো মরিচের সবুজ পাতায় ঘুমন্ত ঠ্যাঙাড়ের মুখ চিনতে আমার অসুবিধা হয় নি। আর্যনীল ভালোবেসে ছবিটি দিয়ে কৌরব অনলাইন 14-র প্রচ্ছদ সাজায়, 2005-এ।

ছবিটি আঁকা হয়ে গেলেও লাইনটি থাকে। কয়েকমাস বাদে ছবিটি দেখতে দেখতে সহসা ছবিটিকে বদলানোর তাগিদ অনুভব করি ও তৈরী হয় নীচের ছবিটি।

Digital Art by Samit Roy

এই অব্দি আঁকা হলে বুঝতে পারি, ছবিটির সঙ্গে সুক্ষ্মভাবে জড়িয়ে আছে একটি লেখা, যেটি তখনো আঁকা হয় নাই, লেখাও। ফলতঃ সামাজিক তথা সাংস্কৃতিক কর্তব্য পালনহেতু আমি বেশ তর তর করে লেখাটি লিখে ফেলে বেশ তর্‌ হয়ে যাই। লেখাটি নিম্নরূপ:

প্রচ্ছদকাহিনী
[2006]

“তোমাকে দেখাতে পারতুম বুনো মরিচের জঙ্গলে ঠ্যাঙ্গাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে”
[প্রিয় কমল চক্রবর্তীকে, যিনি আমাকে বাংলা গদ্য লিখতে শিখিয়েছিলেন]

তোমাকে দেখাতে পারতুম:

তোমাকে দেখাতে পারতুম বললেই তোমাকে দেখাতে ইচ্ছে হয় খুব এই শহরসীমানার আকাশরেখায় ইঁট ইঁট বালি কাঠ পাথর পাথর আর চুনকাম চাতাল - এ সমস্ত জুড়ে কী চমৎকার বুনো মরিচের লতা ক্রমে বেয়ে উঠছে ঘন সবুজ ছায়া অ্যাপ্ড়ন ঘেঁষে ঘুমিয়ে পড়ছে ঠ্যাঙাড়ে রোদএর মতো আমাদের বাংলা মানেবই, ডিক্‌শনারী, ক্লাসটেস্ট, পরীক্ষার সুতোবাঁধা খাতা আর লাল কালি ডট পেন। আমাদের বোল ফুটছে মোম মোলায়েম গোলমরিচের ঝোপে দেখো শানিয়ে উঠছে আমাদের কাস্তেকাহিনীর গঠনরীতি আর তার হাতলবিহীন আলগা কারুকাজ। এইসব, এ সবই তোমাকে দেখাতে ইচ্ছে করে আজ ঝোপলতার ভারী পাতায় কেমন গড়িয়ে গাঢ় হচ্ছো তুমি মাদাম সবুজ আর গোকুলে বেড়ে উঠছে আমাদের লিখনভঙ্গির হাহাকার, ঘুমখুনিয়া মরিচলতায় আঁকা আমাদের এইসব এলোমেলো প্রচ্ছদগাথা; ছবি।

বুনো মরিচের জঙ্গলে:

বুনো মরিচের জঙ্গলে তোমার কথা ভাবতেই জীপচিৎকারের আলো ছিটকে পিচরাস্তার চেরা সিঁথি আর ঝুঁকে থাকা অরণ্যকেশে ফুটে ওঠে ঠ্যাঙাড়ের ঘুমন্ত চোখে এক অনর্গল পেন্সিলকাহিনী ও তার বাঁধানো মলাটে ঘেরা রুলটানা হোমটাস্ক; কাহাদের নামলেখা খাতা। এ বনবীথি মাঝে সন্ধ্যা নামিলে দুরূহ মরিচলতায় দেখো মৃদু আলোড়নে কেঁপে ওঠে আমাদের শ্বাসবৃন্তে ঝুলে থাকা বানানবিধির ছাপানো পোস্টার আর ব্ল্যাকবোর্ড জুড়ে আঁকা চকখড়ি, শেষ পিরিয়ডে নেওয়া যত ব্যাকরণ ক্লাস। এবারে তবে তুমি এ ঘুমপাতার মরিচ আঁধারে দস্যুর চেনামুখ দেখো কেমন দাগিয়ে দেওয়া প্রশ্নপত্রে খুব গাঢ় ও সবুজে ঝিম জমেছে এইসব বর্গীর বুলবুলি গান। তবে কি, আজ এ মরিচবনে এই-ই হবে আমাদের ঘুনু-ঘুনু খেলা?

ঠ্যাঙাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে:

ঠ্যাঙাড়ে ঘুমিয়ে পড়েছে জেনে এখন দেখো এ মরিচজঙ্গলে শান দেওয়া হয় পুস্তকবারান্দায় চাপা রাখা আমাদিগের অষ্টমশ্রেণীর দেওয়ালপত্রিকা ও তাহার শেষনাহওয়া গল্পগুলির তক্তাপোষা ব্লেডবিদ্রোহগাথা। বুনোমরিচের ঘুমজঙ্গলে এখন আমাদের শিবিরকথনের ক্লাস শুরু হয় ফার্স্ট পিরিয়ডেই বি.সি.বি.-র রোলকল হয় পেজেন প্লিজ আর লাস্ট বেঞ্চের পুরনো হাতলে দএখো বানানবর্ণনায় কম্পাস লেখা হয় খুলে রাখা সাদামোজা টিফিনবাক্সের শান্ত পাঁউরুটিদের কথা। তোমাকে দেখতে পারার প্রসঙ্গে আজ আমাদের রোজটিপিনের আলুমরিচে ঘুমিয়ে পড়ে ঠ্যাঙ্গাড়ের জঙ্গলবই আর তার আঁকাবাঁকা ফটোবিকেলের গলার বোতামআঁটা বেমওকা নীলডাউনের প্রথা। তোমার এ মরিচবনে আজ ঠ্যাঙাড়ের ঘুম দেখে খুব হ্য় খুনফাবড়ায় টিউশানি টেবিলগুলির জনিসোকো মিস্‌ করা রচনাবইয়ের সাথে ব্রাউন মলাটে ঘেরা খাতা। তবে কি ক্লাসবৃ্ত্তের বানারেখায় আজি পুরাইলো ঘুমঠ্যাঙাড়িয়া ভেউবৃ্ত্তিরো পালা!

Unable to see Bengali text? Read this text as a GIF »

লেখাটির প্রথম কিছু অংশের ইংরিজিফরাসী ভাবানুবাদ করেন, রুফ্‌লাকেত দোরে মহাশয়।

পুনর্নির্মাণ

Monday, October 1st, 2007

DIgital art on reconstruction by Samit Roy

আমার মনে হয়, শিল্পবস্তুর নির্মাণ অর্থে পুনর্নির্মাণ হয় উপভোক্তার চেতনায়, উপভোক্তারই সচেতন বা অচেতন প্রায়াসে। শিল্পবস্তুর মালিকানার দাবীতে শিল্পীর থেকে উপভোক্তা এগিয়ে থাকেন। শিল্পী একটি প্রক্রিয়ার শুরু করেন মাত্র আর সেই প্রক্রিয়া সম্পূর্ণতা পায় উপভোক্তাগণের চেতনপ্রবাহের আবেশপ্রাপ্তিতে।

আমি যখন, ‘মোনালিসা’ দেখি, তখন আমি ভিঞ্চিসায়েবের হাতের কাজ যতটা না দেখি, তার থেকে বেশী দেখি - এই বাঁধানো রংমাখানো কাপড়ের টুকরোটিকে ঘিরে পাঁচশো বছর ধরে গড়ে ওঠা ইউরোপীয় শিল্পবোধের বিকাশ; দেখি শিল্পভোক্তাদের চোখ ও চেতনা জুড়ে সুদীর্ঘ সময় ধরে ‘মোনালিসা’ নামক এক সৌন্দর্যপ্রতিমার গড়ে ওঠার কাহিনীকলাপ; দেখি সৌন্দর্য মানে পেলব ত্বকের উজ্জ্বল গম; দেখি শতাব্দী পর শতাব্দী ধরে দীর্ঘ জনশ্রেণী ধৈর্য ধরে রূপসী রমনীর ব্রীড়া বলতে চিনে নিচ্ছে দেওয়ালে আঁটা এক টুকরো সোনালী ফ্রেম। আর দেখি, কিভাবে হাজার হাজার মোনালিসা উড়ে যাচ্ছে অটোরিকশার ব্যাকসীটে, পুরুষ সেলুনের দেওয়ালে আঁটা ভারী স্তনে, জালি পোস্টারে, বসে আঁকো বালিকার প্রবল পেনসিলে। দেখি পুনর্নির্মাণ

একটি গোঁপের মৃত্যু

Saturday, June 9th, 2007

Death of A Moustach - Paiinting of Samit Roy

বীরাপ্পান নামক এক জঙ্গল দস্যুর কথা শুনতাম কৈশোর থেকেই যে কিনা চন্দন কাঠ আর হাতীর দাঁতের চোরাকারবারী ছিলো বনমহল্লায় । বহু বছর খবরের কাগজের মাপকাটা ফ্রেম ছাড়িয়ে বেরিয়ে আসতো তার প্রকান্ড গোঁপের গাঢ় অন্ধকার । আমাদের কিশোর সম্ভ্রমে ভয় ধরতো চারা চারা । বহুচেষ্টার পর 2004-এ …

Glo-বাল-isation

Friday, April 20th, 2007

Digital Painting - Globalization by Samit Roy

দৃশ্যতঃই আমাদের সর্বদেহে, বিশেষতঃ গালে ও মাথায় ঝিকিমিকি বাল গজাইতে থাকে গ্লো-বালাইজেশন চলে চমৎকার।

সুমনের ছবি

Friday, March 23rd, 2007

Untitled Painting of Sumankalyan Ghosh

সুমনকল্যান আমার ইশকুলে পড়তো। 4-5 বছরের ছোটো থাকায় দিশী বাংলা মিডিয়াম ইশকুলের নিয়ম মেনে তার সাথে বেশি খাজুর গড়ে ওঠে নি সে সময়ে। আলাপ জমে স্কুল ছাড়ার বেশ 3-4 বছর বাদে। সুমনের তখন সদ্য পাখা উঠেছে। কচি ও ফুঁয়ো ফুঁয়ো নরম লোমে ঢাকা। ছবি আঁকবে ঠিক করে ফেলেছে আর আমাকে ডাকতে শুরু করেছে ‘মানিকদা’ বলে। কারণ জিগ্যেস করলে বলে, ‘এমনিই! তোমাকে ভালো লাগে বলে’। একথা ব’লেই বোঁ করে এক পাক ঘুরে নেয়। ওরকমই! এক পায়ের গোড়ালিতে ভর দিয়ে বাঁই করে দুটো পাক - হাত উপরে তোলা, মুখে মৃদু হাসি , চোখদুটি কখনো বোজা মৃদু চশমায় গভীর। কখনো ফুটপাথে, কখনো ট্রামলাইনের টিটেনাসে। এটা নাকি ওর আনন্দ প্রকাশ।

একদিন এক বাঁজা সন্ধ্যেয় খুব ছিলিম উড়েছিলো যেদিন ডিকি ভাইয়ের ঠেকে মুরগি কাটা হয়েছিলো আর শিবু এনেছিলো নিজের ঠেকের ‘গ্র্যান্টি’ চোলাইয়ের ব্যাগ-ব্লাডারে একাকার । সেই সপ্তমীর রাতে, সুমন মুরগির রক্তে আঙুল ডুবিয়ে ডুবিয়ে ছবি এঁকেছিলো ডিকির ভাই ডিস্কো’র ঘিয়ে রঙের টি-শার্টে, নিরীহ দেওয়ালে, দেবস্থানে আর খুব মিহিসুরে কেঁদেছিলো বহুক্ষণ।

সুমন এখনো ছবি আঁকে। পরিচিতি বেড়েছে তার। বরোদায় থাকে। ফোন করে আচমকা, প্রায়শঃই। ছবি পাঠায়। কাঁদে না তবে শুধু ভালো থাকা-না থাকার গল্প বলে , খামে ভরে পাঠায় ধুপকাঠি, হিন্দি হনুমান চালিশা, ছিট কাপড়ের টুকরো চেক চেক, কখনো খাঁচা ভরা বদরিকা পাখির ছবি, রাজ হাঁস, ঝগরুটে ময়ুরের পেখম।

সুমনের ছবিগুলি তুলে রাখা যায় এইখানে ভালোবেসে।