ভ্রমণকাহিনী
Friday, March 9th, 2007ভ্রমণকাহিনী
[2004]
এক:
আমাদের শষ্যক্ষেত্র ভারী হচ্ছে তখন আর বন্দর পেরোলেই একে একে আলোকস্তম্ভ পথ ও বৃক্ষসমূহ ঝুঁকে পড়ছে রাত্তিরে, পাষাণ ল্যান্ডস্কেপে। হাওয়ার জানলায় কাঁচ লেগে গেলে দেখা যাচ্ছে প্রায় চৌকো এক একটি বাক্স জুড়ে কিভাবে টুপ্ টুপ্ ক’রে অন্ধকার জ্বলে উঠছে দেখা না যাওয়ার মতো দূরত্বের দিগন্তে। একটু এগোলেই আলপথ বরাবর ডানদিকে ওৎ পেতে বসে থাকছে পাথর, ঠান্ডা, অনেকটা পাহাড়ের মতো ছোপ ফেলছে মাঠশেষে অন্ধকারে কালো কালো পাহাড় বলে মনে হতে পারে ব’লে। ধাবা ও সীমান্তের গ্রাম থেকে হঠাৎ হঠাৎ লন্ঠন ছল্কে মুহূর্তেকের জন্য চলে আসছে সরকারী বিদ্যুৎ আর পরের জনপদ শুরু হওয়ার কথা হলে জেগে থাকছে নক্ষত্রপুঞ্জ, স্থির ও মাটির কাছে নেবে এসেছে ভেবে।
দুই:
ভূল করে সারা রাত্রি বাইরে মেলে রাখা হিমের চাদরের মতো শেষরাতের রাস্তা ক্রমশঃ পায়ের সামনে জমিয়ে রাখতে থাকে নিচু নিচু পাহাড়। স্ট্রেইট ডাউন যাইয়ে, ছাড়িয়ে একটু এগোলেই ডানদিকে থাকে থাকে সিঁড়ি উঠে গ্যাছে দ্যাখা যেতে থাকে আর আরও অনেক সামনে অন ইওর লেফট সাইড ইউ উইল ফাইন্ড দা বোর্ড ব’লে মাথায় সাদা কাপড় জড়িয়ে নিয়ে আগে আগে হেঁটে যেতে থাকে নরম নরম রাস্তা। তখনো ভোর হয় নি ব’লে তার রঙ মনে হতে থাকে বাষ্পের মতো হলুদ অথচ একটু ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব পেতে পারেন ব’লে সঙ্গে দু’একটা হাল্কা গরম জামা বা উইনচিটার রাখা ভালো।
তিন:
পাথুরে চাতালের মতো ছড়ানো রোদ্দুর পেরোতেই ভেসে আসে তিব্বতী গুম্ফার আদল আর অজানা বাদ্যযন্ত্র ও গম্ভীর মন্ত্রোচ্চারণের সমবেত স্বরগুলি মনে হতে থাকে মৃদু চোখে প্রাণপণ ছুঁয়ে আছে দূরবর্তী পাহাড়ের ভিজে ভিজে বাঁক। তাদের কাঁধে ও মেরুন পোষাকে ঝুরো ঝুরো তুষারের স্মৃতি নিয়ে বাধ্য বালকের মতো ঠা ঠা রোদে ছোটাছুটি করতে থাকে থাকে থাকে পুরনো পুঁথি ও থাংকার হল্দে হয়ে আসা ভঙ্গুর বিবর্ণতা আর বরফে ঢাকা পর্বতশৃঙ্গগুলি বৃদ্ধের মুখ থেকে আবছা গল্পের মতো বেরিয়ে এসে একে একে ঝুলে থাকে ফ্রেমে বাঁধানো ছোটো ছোটো দেওয়ালে। অথচ একটু দূরেই অগভীর জলে পায়ের পাতা ঈষৎ ডুবিয়ে শ্যাওলাঢাকা নিশ্চিন্ত পাথরেরা অদৃশ্য হাতিদের পোষমানা শিকলের শব্দে মগ্ন হয় প্রেমে ও পিকনিকে আর তাদের ঠান্ডা হাওয়া ও বুনো আমের গন্ধ ক্রমেই ছড়িয়ে পড়তে থাকে গুম্ফার ছবিতে যেখানে চারজন আকাশপ্রতিম দেবতা তাদের সোনার অঙ্গে মেখে নেয় ভ্রমনপিপাসু মোমবাতিদের বিষ্মিত চোখ আর খুলে রাখা জুতো।
চার:
বিকেল নাগাদ জলপ্রপাত চলে যেতে পারেন ঠিক শহর ছাড়িয়েই যেখানে ঢালু হয়ে নেমে গ্যাছে কফিক্ষেত জুড়ে ছড়িয়ে থাকা ব্যক্তিগত গোলমরিচের ঘ্রাণ আর মৃদু মৃদু ফার্ণেদের শরীরে জলকণা জমে থাকা আঙুলের ঈষৎ ছোঁওয়াতেই ঝরে পড়ছে টুপ্ টুপ্ মাটি ও পুরনো পাতায়। কাফি-টি-কোলডিঙ্ক আর সিগারেটের দোকানে জড়ানো হাল্কা গেটের মতো বিজ্ঞপ্তি পেরোলেই দেখা যাচ্ছে ধাপে ধাপে সিঁড়ির মতো পা নেমে গ্যাছে বহু নীচে আর পড়ন্ত জলের শব্দে সেখানে লোহাটে ব্রীজের উপরে ঝুলে রয়েছে ভারী শ্যাওলার মতো মেমটুপিদের গান ও গল্পগাছা। ব্যাস্ এখানেই এরকম বসে বা দাঁড়িয়ে থেকে ইতস্ততঃ ঘুরে দেখে নিতে পারেন জলেদের প্রকাশ্য চান ও পাথর, আর সটান বৃক্ষসকলের জলছবি আলোয় আপনি চুপচুপে গেলে বুঝতে পারবেন স্থানীয় ড্রাইভারের চোখ এবারে চেপে বসবে উইন্ডস্ক্রীনের সরু সরু অন্ধকার বাঁকে। রোজকার কুয়াশার পাশাপাশি তার টায়ারের দাগ ঝুঁকে ফিরবে শহরের দিকে আর সিনেমার গানের সঙ্গে তাল দিতে থাকবে লাল-কালো স্টীয়ারিং-এর খুশী খুশী শিস্।