Posts Tagged ‘Bengali Prose’

একটি গঠনমূলক নির্মাণ

Thursday, April 24th, 2008

একটি গঠনমূলক নির্মাণ
[২০০৮]

২৭শে জুলাই ২০০৭: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমি, পোড়ো ও প্রস্তর, সেদিক পানে চাইলে বিকালে ও সকাল-সন্ধ্যায় খুব কলরব হয়। কাহাদের অটোকথায় দেখা যায় চামড়া ও রেক্সিনের তেলমোটা রঙ আর নারিকেলবীথি মাঝে লাল-কালো সুর্যাস্তের ক্যালানে ক্যালেন্ডার; কখনোবা হাতেআঁকা নায়িকার বিহ্বল বুকপাছার আশ্চর্য অনুপাত; কারো কারো প্রিয় ডাকনামগুলি; টা টা ওকে হর্ণ প্লিজ; দৈবাৎ বুরি নজরবালা কালা মুখের সচিত্র বিবরণ ও গ্রামীন ব্যাংকের অসীম বদান্যতার কথা। অবশ্য অন্য সময়, যেমন ভো্রে কিংবা শিশুরাতে, সেখানে বাসা বাঁধে কতগুলি পলিথিনজল পরিবার, তাদের অ্যাসবেসটস গেরস্থালীর ঘরোয়া রোয়াব আর স্খলিত ঝামঝগড়ার ঝংকার।

২৭শে মে ২০০৮: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমির উপর নিখুঁতপ্রায় ডাইনোলোহার দাঁত, নবীন ও মুখর, সেদিক পানে চাইলে সকালে ও দুপুরে-বিকেলেও খুব কলরব হয়। ধাতুশব্দে শব্দরূপ শব্দের রূপ পেলে, কাহাদের হাত ও মেশিনবর্তী অঙ্ককাহিনীর জেরক্স জুড়ে দেখা যায় ছোটোবড় কাঠামযাপনের বিজ্ঞপ্তি বিলি হচ্ছে উঠোনে জানালায় আর ইস্পাত সাফল্যে মেদিনীর পুর থেকে তুলে আনা হচ্ছে মাটি ও মদ্যের ঘনঘোলা মিশ্রণ ; তাহাদের ব্যক্তিগত নদীসামগ্রীর ধাতুকলেবর। অথচ অন্য সময়ে, যেমন ভোররাত বা সন্ধ্যার ঝোঁকে, সেখানে সেয়ানা কংক্রীট কাঠের দোহাই দিয়ে নৈঃশব্দ শুয়ে থাকে গোটানো ঘামের ঘ্রাণনির্মাণ আর হলদে বাল্বে ঢাকা ফাঁকা প্রতিধ্বনিমৃদু এক চল্লিশোয়াট সাইক্লপ।

২৭শে মার্চ ২০০৯: আমার বাসার পাশে যেইদিকে ফালিফাঁকা জমি থেকে উঠে যায় ধাপসিঁড়ির পোষা সাপ, কালো ও শীতল, সেদিক পানে চাইলে সকাল-বিকাল আর সন্ধ্যেবেলায় খুব কলরব হয়। ফুলটবের বাহারে, ছেঁড়া হাওয়ার টুকরোগুলিকে টাঙিয়ে রাখলে করিডরমহলে দেখা যায় ছোটোবড় সাইকেল জমেছে কাহাদের পাপোষে গণেশে আর ঘরে ঘরে বারান্দাদরোজার পিতলে গাঁথা হয়েছে টিভি বিজ্ঞাপনের বাঁকানো উঠোন ও নাচতে নাজানা রমনীগণের আমরণ অনশন অনিদ্রার কথা। ফলতঃ অন্য সময়ে, যেমন মধ্যরাতে ও চাতালদুপুরে, সেখানে ছোট ছোট বাক্সগুলি থেকে বেরিয়ে আসে ঘুলঘুলিঘষা ভেজা মেঘ আর তাদের ন্যাকাটে আব্দারঘেঁষা ছাঁকনিগুলির ফিস্‌ফিস্‌ শ্বাসধনি; ঘুরন্ত এসিপাখার আবছা ঘুন ঘুন।*

—————————–

* লেখাটি প্রকৃতপক্ষে লেখা হয় এপ্রিল ২০০৮-এ যখন পুরনো ফোল্ডার ঘাঁটতে ঘাঁটতে ২৭শে জুলাই ২০০৭-এর একটি লেখা পাই, যা কিনা, আমার থাকার জায়গার পাশে পড়ে থাকা একটি ফাঁকা জমির দৈনন্দিন জীবনযাপন নিয়ে লেখা, যে জমিটি, সেই সময়ে অর্থাৎ ২০০৮-এর এপ্রিলে, একটি নির্মীয়মান ফ্ল্যাট ইমারতের আদল নিয়েছে। এইসময়ের সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে যখন আমি গদ্যাংশটিকে পুনরায় লেখার চেষ্টা করি, তখন দেখি লক্ষিত বস্তু বদলে যাওয়ায় তার প্রতিচ্ছবিও স্বাভাবিক বদলে যেতে শুরু করেছে। এবিধ আবিষ্কারে আমি পুলকিত হয়ে লেখাটি নতুন করে লিখতে প্রবৃত্ত হই এবং একটি ফাঁকা জমির সামান্য অতীত, দৈনিক বর্তমান ও অদূর ভবিষ্যত নিয়ে একটি লেখাই তিনবার লিখি তিনটি প্রায়-কাল্পনিক তারিখে, যেগুলির মধ্যে সচেতনভাবে রেখে দিই এক একটি দশ মাসের পোয়াতি ব্যবধান।

কিচাইনগাথা

Sunday, March 16th, 2008

কিচাইনগাথা
[2006]

কিচাইনগাথা: এক

এইভাবে ক্লিক্‌ফাঁদে দীওয়ানা হলে সত্যিই বড় ঝট্‌কা লাগে এসকল নেটযাপন, যেখানে নখাগ্রে ঝিলিক দেয় তামাম দুনিয়া আর মুখ ও মুখের বিকল্পে মুখোশ ও মুখোশেরও বিকল্পে পুনরায় অন্য মুখের ভীড়ে উড়ে যায় আমাদের সামাজিকতার টুপি ও খোলাচুল এই মেঘবন্দরে ছেয়ে যায় চামচা আকাশ। আমরা ভালো থাকি অথবা এভাবেই দাবী করি আমাদের ভালো থাকার সম্ভাবনাসমূহ সুতলিবদ্ধ পুত্তলিকাবৎ হাতে কাপড়ের তলোয়ার আর রাংতার মাথামুকুটে নাচতে থাকে গোপন ইশারার মতো রাষ্ট্রযন্ত্রের অনর্গল তাগিদে। অথচ দ্যাখো, এই প্রাঙ্গনে যেন অন্য কথা ছিলো, কথা ছিলো এবারে আমরা সকলে সিনেমা দেখবো পর্দার উলটো পিঠে আলোকিত থিয়েটারহলে সেইসব চাপা ও কৃষ্ণবর্ণ ছবিগুলি, মানুষের নজর থেকে বেরিয়ে আসা সাদা হলুদ বা কমলা কোনো রোদ না পেয়ে যেগুলি এখন শুকনো ও পাটল। এরকমই যেন কথা ছিলো তবে কার কথা কে ও কবে দিয়েছিলো সে প্রশ্নে এমনকি এ দামড়া আকাশব্যাপী আমাদের নিরন্তর তথ্যযাপনেও কোনো উত্তর থাকে না। ফলে এ চামচক্রান্তে যোগ দেয় প্রযুক্তিস্নেহ, আর মোয়া আসে চমৎকার, জনপ্রতি এক বা দুই, দিগন্ত জুড়ে দেখা যায় আমাদের হাসি হাসি মুখ, যা কিনা ঘন ক্লোজআপে কিছুটা কৃতার্থ করজোর তেলতেলে শব্দেঘেরা সেই হারামী ভাস্কোর জাহাজের পোঁ শোনা থেকে।

কিচাইনগাথা: দুই

জামার হাতা গুটিয়ে কনুইয়ের উপর তুললেই চামড়া কিছুটা সাদাটে ও ফ্যাকাশে যেন রোদ না লাগায় রংগুলি হারিয়ে গ্যাছে ইঁটচাপা ঘাসে। ফলে বারংবার মনে হয় আমরা সকলেই প্রকৃতপ্রস্তাবে ফর্সা ও কর্কটক্রান্তির চড়া রোদে কিছুটা তামাটে মাত্র ভাগ্যদোষে। এবিধ চিন্তা এলেই তৎক্ষণাৎ মেরুদন্ড বেয়ে শির শির ওঠানামা করে চামড়া ও ঘামের রঙসংক্রান্ত এ সুপ্রাচীন ছেনালীগাথা, রূপোর মোড়কে যার চাবুক থেকে সাবানের ফেনা ঘষে উঠে আসে ফেয়ার অ্যান্ড লাভলীর প্যাকেট ও তার সাদা আদিখ্যেতার চিট্‌চিটে ঘাম। আমাদের কেল্‌টি চামড়া লোভী অথচ পোষা ফলতঃ লালায়িত কুকুরের মতো বারবারান্দায় বাতিল ডগবিস্কিট খায় গুটোনো লেজ নাড়ে আনুগত্যে ভারী হয়ে ওঠে তার রোঁয়া ও চেনবকলেস আর এ অবশ্যম্ভাবী মেলানিনচক্রের নিচে দাঁড়িয়ে থাকে যেন কোনো রুগ্ন বেশ্যা সন্ধ্যের ল্যাম্পপোস্টের নিচে সস্তা প্রসাধনের রিবেটে মুছে ফেলে নামধাম, তার বাড়ির ঠিকানা। এ চামচেতনায় বিষাক্ত পাখির ছায়া বাসা বাঁধলে গোপন ছুরির মতো আস্তিন থেকে বেরিয়ে পড়ে বাণিজ্যজাহাজের ফাঁকে ফাঁকে গুঁজে রাখা সাদা স্বভাবগুলির সোনালী হারামিপনা ও পিজারোর নাম লেখা বোতলবন্দী চিঠি ও সনদ, যা দেখে আমাদের চামড়ার বয়স কেঁপে ওঠে মোমবাতির ছিবড়ের মতো পড়ে থাকে শুধু আমাদের লেহনলিপ্সা, আমাদের চামচেতনা, ভয়।

কিচাইনগাথা 1 - 10

ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ ও ঝুপো গোঁপেদের গল্প

Saturday, March 15th, 2008

ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ ও ঝুপো গোঁপেদের গল্প
[2007]

প্রথম অধ্যায়

সাঁঝের ঝোঁকে ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপের চিল্‌তে বারান্দাবারে ডিগবাজি খায় ঝুপো গোঁপগুলির বাগানো বাগান আর টেবিলের বাদামবিন্যাসে দেখা যায় কুটি কুটি দু’একটি ইংরিজি শব্দ পড়েছে টি-শার্টের কালোতে লেখা হয়েছে মিস্টার লেননের চশমার খোপকাটা গালিচার কথা। এখন ঝুপো গোঁপেদের বাগানো বাগানবারের বারান্দায়, চুপচাপ চাকুর মতো চমৎকার চিন্তা চুষে, আমাগের চেতনার চিতাবাঘ বীয়ার গেলে ইংরিজিতে এবং কথা বলে যেমত অনর্গল তা-ও ইংরিজিতে।

দেখে বোঝাও যায় না ক্যালাকেলি হয়ে গেছে, বহু আগে, গোপনে, কিছুটা বিপ্লবের ঢং-এ।

দ্বিতীয় অধ্যায়

অথচ কি বিকেল কি সন্ধ্যেয়, হাজার গান গাইলেও আজকাল আমাদের ছাদে কেউ বসে বসে কাঁদে না বরং কান্নার কথায় আমাদিগের পেছন ভারী হয় ও খুদে বারবারান্দার টিনসাইনে ভেঙ্কটেশ্বরা ওয়াইন শপ লেখা হলে সিগারেটের ধোঁয়া পাকিয়ে পাকিয়ে ওঠার বদলে নীচে নামে। পানশালার সামনে হিসি করলে ভাড়াটে পেয়াদার হাতের থাবায় এক মুহূর্তে আমাদের সকলের নাম হয় শ্যামলবরণ আর আমাদের বর্গক্ষেত্রগুলি গোনাগাঁথা হয়ে যায় এ রাতের কথায় দাগচিহ্নে হিসেব রক্ষিত হয় আমাদের নামের পাশে টিকমার্কে লিখে রাখা হয় সালতামামি ও ক’ বলে ক’ উইকেট এহেন দুর্বোধ্য সব ডাটা।

আর নেপথ্যে পোস্টার পড়ে এই মর্মে যে সব কিছুই হে কমরেড বিপ্লবের স্বার্থে।